Categories
Astrophysics

তারাদের ঝাড়ু

আমার নানুবাড়ির গ্রাম সবচেয়ে কাছের শহর থেকেও মোটামুটি বেশ দূরে হওয়ায় সেখানে কিছুদিন আগেই মাত্র বিদ্যুৎ লাইন পৌঁছে। তাই ছোটবেলা থেকেই কালেভদ্রে সেখানে বেড়াতে গেলে শহরের একেবারেই উল্টো প্রকৃতি আর জীবন-যাপনের প্রতি একধরনের কৌতূহল মেশানো মুগ্ধতা সবসময়ই কাজ করত। আর সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করত রাতের আকাশ। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সেখানে সন্ধ্যার পরই ঝুপ করে রাত নেমে আসত। কেরোসিনের বাতি আর হ্যারিকেনের মৃদু হলদে আলোয় সে অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে উঠত। এই পটভূমিতে তারাভরা আকাশটাকে মনে হত বুঝি সত্যিকারের হীরের টুকরো দিয়ে সাজানো। সেখানেই মায়ের কাছে প্রথম আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেনা, মনে মনে তারা জোড়া লাগিয়ে সপ্তর্ষিমন্ডলের প্রশ্নবোধক চিহ্ন খুঁজে বের করা– – আর সেখানেই আমার জীবনে প্রথম এবং সবচেয়ে সুন্দর ধূমকেতুটি দেখা। অনেক পরে যার নাম জেনেছি ‘হেল-বপ’ (Hale-Bopp) যা ১৯৯৭ সালের গোড়ার দিকে নিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থায় ছিল। 

এখনো মনে আছে, দিগন্তের কিছু উপরে ছোট্ট একটা আলোর ঝাড়ু–র মত তারা দেখে কতটা কৌতূহল জেগেছিল মনে। কিন্তু সেই কৌতূহল মিটতে অনেক সময় লেগেছে। ধূমকেতু আসলে কী, এর উৎপত্তি কোথায় আর কেন – এরকম প্রশ্নগুলোর উত্তর একটু একটু করে জেনেছি। ‘ধূমকেতু’ কথাটা শুনলে তোমাদের মনেও নিশ্চয়ই এরকম প্রশ্নগুলো আসে, তাই না? তাহলে ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক!

‘ধূমকেতু’ – শব্দটার আক্ষরিক অর্থ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘ধোঁয়ার নিশান’। আবার এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Comet’ এসেছে গ্রীক শব্দ ‘Kometes’ থেকে যার বাংলা অর্থ বলা যায় ‘লম্বা চুলের তারা’। দু’টি নামেই পাওয়া যায় ধূমকেতুর ঔজ্জ্বল্য আর একটা ‘লেজের’ মত অংশের আভাস। আসলেও তাই। লেজের আকারের জন্য ধূমকেতু দেখতে শলার ঝাড়–, ধোঁয়ার পতাকা কিংবা লম্বা চুলের ঝুঁটি – নানারকমই মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুটা শক্তিশালী দূরবীনে দেখে যদি আমরা এর গঠন বুঝতে চাই, তাহলে মোটামুটি তিনটি অংশই পাওয়া যাবে। সেগুলো হল – নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রকণা (Nucleus), এটিকে ঘিরে থাকা ধূমকেতুর সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ কোমা (Coma) আর একটি বেশ বড়োসড়ো লেজ (Tail)। এগুলোর মধ্যে কেন্দ্রকণাই এর মূল স্থায়ী অংশ। বাকি দুটো কিছু বিশেষ সময়েই তৈরী হয় আর কেবল তখনই আমরা এদের দেখতে পাই। কেন্দ্রকণার আকার বেশ ছোট (কয়েকশ’ মিটার থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত)। এর প্রায় অর্ধেক উপাদানই হল ধূলো, বালুকণা বা ছোট পাথরের টুকরো। আর বাকি উপাদান হল পানি, অ্যামোনিয়া আর মিথেনের বরফ। এছাড়া সামান্য পরিমানে গ্যাস বা উদ্বায়ী পদার্থ থাকতে পারে। তাই নিউক্লিয়াসকে বলা হয় ‘নোংরা বরফের গোলা’ বা ‘Dirty snow ball’।এই গোলাটি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের মত একটা নির্দিষ্ট পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এভাবে চলতে গিয়ে এটি সূর্যের মোটামুটি কাছে (প্রায় পৃথিবীর থেকে দূরত্বের তিন গুণ) চলে আসলে এর কোমা বোঝা যায়। কোমাটি মূলত ধূলোবালির তৈরি যা ধূমকেতুর গতির কারনে এর কেন্দ্রকণার আশেপাশে ছড়িয়ে পরে। আর লেজটা প্রায় ১০,০০,০০০কি.মি. থেকে তার ১০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। ধূলোর তৈরি লেজের রঙ হয় হলদেটে আর আয়নিক কণার তৈরি হলে তার রঙ হয় অনেকটা নীলচে।  

লেজটা আসলে কেন হয়? ধূমকেতুতে যেহেতু প্রচুর বরফ থাকে, সূর্যের কাছাকাছি আসলে এগুলো গলতে শুরু করে। সূর্যের দিকে (বা বিপরীতে) ধূমকেতুর গতির কারনে এর গতির উল্টো দিকে এই গলে যাওয়া পদার্থকণাগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে লেজের মত অংশ তৈরি করে। আর সূর্যের আলো এই পুরো অংশে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে বলেই আমরা এত অদ্ভুত সুন্দর আকারের মহাজাগতিক বস্তুটি দেখি।  ধূমকেতুটির সূর্যকে ঘিরে ঘুরবার পথটি কত বড় তার উপর নির্ভর করে এটি কতদিন পরপর পুরো পথটি ঘুরে আবার সূর্যের কাছে আসবে, অর্থাৎ আমরা দেখতে পাবো। তার উপর ভিত্তি করে ধূমকেতুকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। স্বল্পমেয়াদী- যেগুলো মোটামুটি ২০০ বছরের মধ্যেই ফিরে আসে; আর দীর্ঘমেয়াদী – যেগুলো ঘুরে আসতে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত লাগে। 

আচ্ছা! ধূমকেতু কি, কেমন বা কতরকম তা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু কোথা থেকে আসে এগুলো? দুটি বিশাল এলাকায় মূলত এদের অবস্থান। কুইপার বেল্ট আর ঊর্ট মেঘ।সৌরজগতের সীমানা অর্থাৎ নেপচুনের পর থেকে প্রায় সূর্য থেকে নেপচুনের সমান দূরত্বের ব্যাসের এলাকা জুড়ে অসংখ্য বরফময় গ্রহাণুর মত ছোট ছোট বন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ অঞ্চলকে আবিষ্কারকের নামানুসারে বলা হয় কুইপার বেল্ট। এই সীমানার বাইরে আরও অনেক অনেক দূরে(সৌরজগতের সীমানার প্রায় হাজারগুণ) সম্পূর্ণ সৌরজগতকে ঘিরে এমনই বরফময় খন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঘের গোলকের মত। এর নাম ঊর্ট মেঘ। এই দুই অঞ্চলের বস্তুগুলোই মূলত ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস। বিভিন্ন কারনে এদের উপর কার্যকর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তারতম্যের কারণে এগুলো থেকে দু’একটি করে হঠাত হঠাত সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের আওতায় পরে যায় আর এগিয়ে আসতে থাকে সৌরজগতের দিকে। সৌরজগতের সীমানায় বৃহস্পতি বা শনির মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে এগুলোর গতিপথ আরও ছোট হয়ে যায়। এগুলো স্বল্পমেয়াদী। আর বাকি ধূমকেতুগুলো রয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদী-ই। এই সবরকম কেন্দ্রকণাই চলতে চলতে সূর্যের কাছে এসে প্রথমে গলে-ছড়িয়ে সৃষ্টি করে কোমা যার একটা অংশ তৈরি করে লেজ। আর সূর্যের আলোর প্রতিফলনে এই নোংরা বরফের গোলাই দৃষ্টিনন্দন ধূমকেতু হয়ে আমাদের মুগ্ধ করে, ভাবায়, কৌতূহলী করে তোলে।

গড়ে প্রতি বছর ছয়টির বেশি ধূমকেতু নতুন আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু খালিচোখে দেখার মত বড় আর নিকটবর্তী ধূমকেতু আছে কমই। এরকম কয়েকটি বিখ্যাত ধূমকেতু হলঃ হ্যালির ধূমকেতু, হেল-বপ, কোহুতেক, শ্যুমেকার, আইসন, লাভজয়, হায়াকুতাকে ইত্যাদি। 

অনেক তো জানা হল। এখন রাতের আকাশে কখনো ঝাড়ুর মত কিছু দেখলে ভড়কে না গিয়ে বরং এটির গলে যাওয়া বরফের গঠন আর দূর-দূরান্ত পাড়ি দিয়ে আসার গল্প শুনিয়ে সবাইকে চমকে দিতে পারবে না? আশা করছি, অবশ্যই পারবে!   

দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা ২০১৪ সালের। চন্দ্রাবতী একাডেমীর শিশু সংকলনের জন্য লিখছিলাম খুব সম্ভবত, মনে নেই। যেহেতু এই ওয়েবসাইট করার একটা মূল উদ্দেশ্য হল আমার টুকটাক লেখালেখিগুলো এক জায়গায় রাখা, সাথে অভ্যাসটাও বাঁচানোর চেষ্টা – তাই প্রথমেই আগের কিছু লেখা পোস্ট করে রাখছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *