Categories
Lifestyle / Tips

করোনা ভাইরাসঃ COVID-19- অবশ্যই জেনে রাখা, এবং মেনে চলার মতো কিছু তথ্য

ভূমিকাঃ 

করোনাভাইরাসের একটি নতুন ধরণবাহিত রোগ, COVID-19 যে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, এবং প্রচুর জীবনহানির কারণ হয়েছে, তা ইতিমধ্যে সবাই জানি। কিন্তু গণমাধ্যমের অপপ্রচার হোক, বা ইন্টারনেটের অবাধ প্রসার হোক, যে কোনো কারণেই এই রোগটির ব্যাপারে সঠিক তথ্যের চাইতে ভীষণভাবে ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তারই বেশি দেখছি। আমি ডাক্তার নই, বা মেডিকেল সায়েন্সের সাথে জড়িত কোনো পেশায় নেই। তবে বিজ্ঞান গবেষণায় থাকার জন্য হোক, বা সাধারন জ্ঞান থাকার জন্য হোক, কোথাকার তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, আর কোথাকার তথ্য আর বিশ্লেষণ এড়িয়ে চলতে হয়, এতোটুকু জানা আছে। পাশাপাশি, পড়াশোনার কারণে আপাত ইউরোপে থাকার জন্য এখানে করোনার বিস্তারের ভয়াবহতা, আর এর প্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, তা নিজে দেখে আর নিজে এর মধ্যে থেকে এর গুরুত্ব অনুধাবন করেই এই কথাগুলো বাংলায় সবার কাছে পৌঁছে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ মনে করে লিখছি। এখানের কোনও কথাই আমার মনগড়া নয়। লেখার শেষে তথ্যসূত্র আর লিঙ্ক দেয়া আছে। এখানে দেয়া তথ্যগুলোর যেকোনো সময়ের সঠিক আপডেটের জন্য লিঙ্কগুলিতে গেলেই পাওয়া যাবে। আশা করি দেখে, পড়ে, সত্যতা যাচাই করে আপনার মন্তব্য জানাবেন, আর পরিচিত কারো কাজে আসবে মনে হলে তাদেরকে লেখাটা পাঠাবেন। এই লেখাটা পড়ে একজন মানুষও যদি আরেকটু সাবধান হন, সেখানেই আমাদের লেখার সার্থকতা, আর কিছু না। – লামমীম, রুসলান   

করোনাভাইরাস কীঃ 

করোনাভাইরাস মূলত একটি নয়, বরং একটি ভাইরাস পরিবারের নাম। এই ভাইরাস কোষের গঠন গোলাকার। এই গোলকের পৃষ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা প্রোটিন দেখতে মুকুট বা ল্যাটিন ‘করোনা’র মতো দেখতে বিধায় এই নামকরণ। ১৯৭০ এর দশকে প্রথম মানুষকে আক্রান্ত করে এমন করোনাভাইরাসের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে, আর এখন পর্যন্ত এর ৭টি ধরণ দেখা গিয়েছে যা মানুষের দেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। গত কয়েক দশকে আলোচিত সার্স (SARS), মার্স(MERS) ও এই ৭ ধরণের মধ্যে পড়ে। ২০১৯ সালে চিনের উহান প্রদেশে এক নতুন ধরণের নিউমোনিয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে এই নতুন করোনাভাইরাস পাওয়া যায়। এর নাম দেয়া হয় SARS-CoV-2 যা পরে COVID-19 (রোগের নাম Coronavirus Disease) নামে বেশি পরিচিত হয়।

এর সাথে সাধারণ ফ্লুর পার্থক্য কীঃ 

চীনের উহানে যখন COVID-19 প্রথম ছড়াতে শুরু করে, তখন বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গাতেই একে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এমনকি সাধারণ ফ্লু তেও COVID-19 আক্রান্ত রোগীদের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাওয়ার সমীক্ষা দেখানো হয়। তবে খুব কম সময়ের মধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি যে COVID-19 মোটেও সাধারণ ফ্লু এর মতো নয়, এতে নিউমোনিয়া এবং কিডনি কাজ করা বন্ধ করে দেয়ার মতো জটিল উপসর্গ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। এই রোগ একেবারে নতুন বলে আমাদের কাছে কোন বিশদ সমীক্ষা বা তথ্য ছিল না, এখনো আমরা প্রতিদিন নতুন করে জানছি এর ব্যাপারে। তবে গত এক মাসেই এই রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুহার চীনে ৪% থেকে ইতালিতে প্রায় ৮% (১৬ মার্চের তথ্য অনুযায়ী)এ পৌঁছেছে, যেখানে ফ্লু তে মৃত্যুহার ১% এর চেয়েও অনেক কম। এর একটি বড় কারণ, COVID-19 এর কোনও কার্যকরী চিকিৎসা, বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। কাজেই এখনো মূল প্রতিকার শুধু রোগের বিভিন্ন লক্ষণের জন্য চিকিৎসা সেবা, আর মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। 

বর্তমানে COVID-19 এর বিস্তার কেমনঃ 

আমি এখন লিখছি সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান সময় ১৭ মার্চ, ভোর ৩টায়। এখন সবচেয়ে শেষ আপডেট অনুযায়ী, বিশ্বের ১৬২ টা দেখে COVID-19 এর সংক্রমণ পরীক্ষার মাধ্যমে সনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১,৮২,৫৫০ – যার মধ্যে ৭,১৬৪ জন মৃত্যুবরণ করেছে, আর ৭৯,৮৮১ জন সুস্থ হয়েছে। এখনও অসুস্থ আছে এমন রোগীর সংখ্যা ৯৫,৫০৫ জন। তবে শুধুমাত্র এই সংখ্যাগুলো দেখে এর সংক্রমণের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। চীনে প্রথম শুরু হলেও, আর সেখানে মোট ৮০,০০০+ মানুষ সংক্রমিত হলেও সেখানের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা খুব বেশি না (প্রতি ১০ লক্ষ মানুষে ৫৬ জন)। সেই তুলনায় ইতালিতে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট ২৭,৯৮০ জন (প্রতি ১০ লক্ষে ৪৬৩ জন, চীনের প্রায় ৯গুন!)। এছাড়া প্রতিদিনই অসংখ্য নতুন রোগীর সংক্রমণ নিশ্চিত হচ্ছে। ইতালিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩,২৩৩ জন নতুন রোগী সনাক্ত হয়েছে। জার্মানিতে গত সপ্তাহের শুক্রবার সারাদেশে রোগীর সংখ্যা ছিল ৬০০+, গত ৮ দিনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,২৭২ তে! গত শুক্রবার এখানে নেদারল্যান্ডে রোগীর সংখ্যা ছিলো ৩ জন, যা আজকে ১,৪১৩ এ দাঁড়িয়েছে। গত একদিনেই ২৭৮ জন নতুন রোগী সনাক্ত হয়েছে এখানে। কাজেই প্রথমে এর বিস্তার তেমন বেশি মনে না হলেও এর বিস্তারের হার ‘সূচকীয়’ বা exponential হওয়াতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণের সংখ্যা আকাশচুম্বী হওয়া খুবই কম সময়ের ব্যাপার।   

কারা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে আছেঃ 

যেহেতু এখন পর্যন্ত COVID-19 এর চিকিৎসার বড় অংশ রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত, বয়স্ক মানুষ (৬০+), আর যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তারা সবচেয়ে বেশি COVID-19 এর জটিল উপসর্গর সম্মুখীন হচ্ছে। আগে থেকেই স্বাস্থজনিত ঝুঁকি বা রোগে আক্রান্তঃ যেমন ক্যান্সার, রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার বা কিডনির জটিলতা যাদের আছে তারাও এই উচ্চ ঝুঁকির আওতায় আছে। তবে যেকোনো বয়সেই রোগের জটিলতা বাড়ার সম্ভাবনা আছে। 

কীভাবে নিশ্চিত হবো যে Covid-19 সংক্রমণ হয়েছেঃ  

এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়ের উপায় হল কণ্ঠনালি আর নাক থেকে লালা আর মিউকাসের স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা। PCR বা Polymerised Chain Reaction নামক পরীক্ষা করে এই ভাইরাসের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য সনাক্তকরণের মাধ্যমে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। তবে তার আগে COVID-19 এর কোষের ভেতরের RNA কে DNA তে রূপান্তর করতে হয় Reverse-Transcriptase এনজাইমের মাধ্যমে। তাই পুরো পরীক্ষাকে সংক্ষেপে RT-PCR বলা হয়। এই টেস্টের ফলাফল পেতে ন্যুনতম ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। আর চাহিদার তুলনায় এই টেস্টের উপকরণ বেশ কম হওয়ায় বেশিরভাগ দেশেই এখন সংক্রমণের বেশ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেলে তবেই টেস্ট করা হচ্ছে। আর টেস্টের সময়টাতে রোগীকে আলাদা করে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। 

উপসর্গ কী কীঃ 

এখনো COVID-19 এর ব্যাপারে আমরা নতুন করে জানছি। সংক্রমণের মধ্যে ৮০% ক্ষেত্রেই উপসর্গ সাধারণ ফ্লু এর মতো, আর চিকিৎসা বাসায় বিশ্রাম নিয়েই সম্ভব। ১৪% ক্ষেত্রে উপসর্গ জটিল, আর ৬% ক্ষেত্রে গুরুতর। এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালে দ্রুত ভর্তি হওয়া জরুরি। উপসর্গ প্রায় সব ক্ষেত্রেই জ্বরের সাথে শুরু হয়। কয়েকদিনের মধ্যে যোগ হয় কাশি। অবস্থা জটিল হতে থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। শ্বাসকষ্ট মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছালে পানিতে ডুবে যাবার মতো অনুভূতি হয় ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে দেখে। এখন পর্যন্ত রোগীদের মধ্যে যেসব উপসর্গ  কমবেশি দেখা গিয়েছে তা হলঃ

  • জ্বর (৯৮% )
  • ক্লান্তি (৭০%) 
  • শুকনো কাশি (৬০%)
  • ক্ষুধামন্দা (৪০%) 
  • গায়ে(মাংসপেশি) ব্যাথা (৩৫%) 
  • শ্বসনে জটিলতা (৩১%)
  • শ্লেষ্মা সহ কাশি 
  • শ্বাসনালী আর বুকে ব্যাথা 
  • মাথাব্যাথা 
  • ডায়রিয়া
  • বমিভাব   
  • মাথা ঘোরা 
  • পেটে ব্যাথা 

কীভাবে ছড়ায় COVID-19, আর ভাইরাস দেহে আসলে কতদিন লাগতে পারে লক্ষণ প্রকাশ পেতেঃ 

অন্যান্য ফ্লু এর মতোই, COVID-19 এর ভাইরাস ছড়ায় আক্রান্ত রোগীর নাক বা মুখ নিঃসৃত তরল থেকে যা হাঁচি বা কাশি মাধ্যমে ছড়ায়। এই ভাইরাসবাহি তরল যদি কোনভাবে আমাদের মুখ, নাক, বা চোখে প্রবেশ করে, তাহলে সংক্রমণ ছড়ায়। হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাইরে আসা তরলের ফোঁটায় থাকা ভাইরাস কতক্ষণ বাতাসে বা কোন পৃষ্ঠে বেঁচে থাকতে পারে, তার কোন প্রমাণসহ উপাত্ত এখনো নেই। সার্স এবং মার্স, করোনাভাইরাস পরিবারের অন্য দুই ভয়ানক সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাসের মানুষ বা প্রাণীদেহের বাইরে বেঁচে থাকার ক্ষমতা বস্তুর উপাদান, পরিবেশ, তাপমাত্রা ইত্যাদি নানান প্রভাবকের উপর নির্ভর করে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত হতে পারে। COVID-19 এর জন্যও এই বৈশিষ্ট্য একই রকম ধারনা করা হচ্ছে প্রাথমিক কিছু তথ্য আর পরীক্ষা থেকে। বাতাসের থেকে স্টিল, প্লাস্টিক, বা কাঠের পৃষ্ঠে এর বেঁচে থাকার সময়কাল বেশি। ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় এই ভাইরাসের এসব পৃষ্ঠে বেঁচে থাকার সময়কাল আরও কমে আসে। তবে একেবারে মরে যায়, তা না। আর কমে এসে সেই সংখ্যা কতোটুকু, এখনো নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। 

COVID-19  ভাইরাস দেহে প্রবেশের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২-১৪ দিন পর্যন্ত লাগতে পারে এখন পর্যন্ত জানা তথ্য অনুযায়ী। তবে এই সময়কাল আরও বাড়তে পারে। 

এর প্রতিরোধে কী করতে পারিঃ 

সাধারণ স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন আর যথাযথ পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা COVID-19 এর বিস্তার প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপশি বিশেষ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে যেকোনো ভিড় বা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর COVID-19 দমনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেয়া পদক্ষেপগুলোর কিছু হলঃ

  • বাইরে থেকে এসে, বা যেকোনো সময় হাত পরিষ্কারে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। হাতের তালুর উল্টো পিঠ, আঙ্গুলের মাঝে, কব্জি – সবজায়গায় যাতে সাবান পৌঁছে খেয়াল রাখা। 
  • একান্তই সাবান বা পানি না পাওয়া গেলে অন্তত ৬০% – ৮০%  অ্যালকোহল আছে এমন স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। 
  • হাঁচি বা কাশি আসলে টিস্যু ব্যবহার করা। ব্যবহার করেই সাথে সাথে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া। 
  • সাথে টিস্যু না থাকলে কনুই তে হাঁচি বা কাশি দেয়া। হাতের তালুতে কোনভাবেই না দেয়া। 
  • হাত মেলানো বা হ্যান্ডশেক না করা। 
  • যেসব জিনিসপত্র বা পৃষ্ঠ (স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, কাজের জায়গা, টেবিল, রান্নাঘরের টেবিল, কাটিং বোর্ড ইত্যাদি) প্রতিদিন ব্যবহার করা হয়, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার আর জীবাণুমুক্ত করা। 
  • মানুষের সংস্পর্শ আর ভিড় এড়িয়ে চলা। একান্তই বের হতে হলে মানুষের থেকে কমপক্ষে এক থেকে দেড় মিটার দূরত্ব রাখা।  
  • হাত দিয়ে মুখ, চোখ, নাক স্পর্শ না করা। 
  • সামাজিক মেলামেশা, অনুষ্ঠান আপাতত বন্ধ রাখা। ইতালি, স্পেইন, নেদারল্যান্ড, কানাডা সহ অনেক দেশে সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আপাতত। স্কুল কলেজে বাসায় থেকে অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। এখানে রেস্টুরেন্ট, জিম, কফি শপ ইত্যাদি বোধও হয়েছে। অনেক দোকানে একসাথে ২/৩ জনের বেশি ক্রেতা ঢুকতে দেয়া হচ্ছেনা যেখানে ১০০ জনের বেশি খুব সহজে কেনাকাটা করতে পারে এমনিতে। দেশেও স্কুল কলেজ বন্ধ হয়েছে। এখন এই বন্ধে বাসায় না থেকে বাইরে ঘুরে বেড়ালে কোন কাজ হবে না এতে। বাসায় থাকুন, প্লিজ। 
  • কম বা বেশি জ্বর, কাশি, সর্দি – যেকোনো উপসর্গেই অন্তত এক সপ্তাহ ঘরের বাইরে না যাওয়া, মানুষের থেকে দূরে থাকা। COVID-19 এর সংক্রমণ না হলেও এসব রোগের কারণের তখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। তাই COVID-19 এ আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আর যদি COVID-19 এ আক্রান্ত হয়েও আপনার উপসর্গ সাধারণ ফ্লু এর মতো হয়, আপনার থেকে অন্যদের মাঝে ছড়ালে এর জটিলতা যে বাড়বে না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কাজেই নিজে সাবধানে থাকুন, অন্যদের ও নিরাপদে রাখুন। 
  • কাঁচাবাজার, আর বিশেষ করে পশুপাখির বাজার এড়িয়ে চলুন। করোনাভাইরাসের সবগুলো প্রজাতিই পশুপাখিদের শরীর থেকে মানুষের শরীরে এসেছে। 
  • সম্ভব হলে বেশিদিন বাসায় ভালো থাকে এমন খাবারের উপকরণ ( যেমন চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন, আদা, মসলা, ডিম, ছোলা, আলু ইত্যাদি ) দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের মতো পরিমাণে কিনে রাখুন। 
  • মাস্ক বেশি করে কিনে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব না। বরং আক্রান্ত রোগী আর চিকিৎসকদের জন্য মাস্ক ব্যবহার অনেক বেশি জরুরি সংক্রমণ ঠেকাতে। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে রোগী বা চিকিৎসা সংক্রান্ত পেশার না হলে মাস্ক না কেনার কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। 
  • ফলমূল, এবং শাকসবজি, বিশেষ করে ভিটামিন সি যুক্ত ফলমূল বেশি করে খাবেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখা বেশি জরুরি এখন। 
  • বাজার, বা টিস্যু, যেকোনো কিছুই কেনার সময় মনে রাখবেন, আপনি একা ব্যবহার করে রোগ সংক্রমণ বা বিস্তার ঠেকানো সম্ভব না, শুধুমাত্র সমাজের সবাই ঠিকভাবে পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে পারলে, আর নিয়মগুলো মানতে পারলেই যথাসম্ভব দ্রুত এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো যাবে। 

শেষকথাঃ 

করোনাভাইরাসকে যে উপেক্ষা করা সম্ভব না তা এতদিনে আশা করি বুঝে গিয়েছি সবাই। এখনি সাবধান না হয়ে উটপাখির মতো বালুতে মাথা গুঁজে রাখলে যে খুব কম সময়ের মধ্যেই এই ভাইরাস ভয়াবহ ভাবে দেশের সবজায়গায় ছড়িয়ে পরবে তাতে কোন সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই আর। তবে একই সাথে আতঙ্কিত হয়ে বাজারের সব টয়লেট পেপার অথবা সাবান কিনে ফেলেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না। গত ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য  সংস্থা (WHO) COVID-19 এর এই প্রসারকে প্যান্ডেমিক বা ‘বৈশ্বিক মহামারী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তা যথার্থ কারণেই। তবে, আমরা সবাই যদি সঠিক তথ্য জেনে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে, এই দুর্যোগ ঠেকাতে যেসব বিশেষজ্ঞ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তাদের উপদেশগুলো মেনে চলি, আর শুধু নিজের কথাই না ভেবে কীভাবে সবাই একসাথে এই কঠিন সময় থেকে বের হয়ে আসতে পারি তা ভাবি, তাহলে অবশ্যই এর ভয়াবহতা ঠেকানো সম্ভব। প্রয়োজন এখন ধৈর্য, সহযোগিতা, আর সবার জন্য সঠিক তথ্য। 

তথ্যসূত্রঃ 

Categories
Astrophysics Knowledge

আজি কতো তারা তব আকাশে?

ছোটবেলা থেকে বড় শহরের বাইরে কখনো না গেলে রাতের আকাশে আকাশগঙ্গা ছায়াপথে হাল্কা মেঘের মতো ছড়িয়ে থাকা তারাদের আলোর দিকে তাকিয়ে যে হাহাকার আর মুগ্ধতা একসাথে তৈরি হয়, তা কল্পনা করাও সম্ভব না। গ্রামের বাড়িতে, বা পাহাড়ে বেড়াতে গেলে শহরের আলো দূষণের বাইরে প্রায় জমাট কালো অন্ধকারে চাঁদহীন রাতে তারাদের আলোর প্রাচুর্য হঠাত দেখলে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। এমন কাব্যিক পরিবেশেও অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, যে আসলে কতোগুলি তারা আছে আকাশে? 

আমি নিজে ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে রাতে লোডশেডিঙের সময় মাদুরপেতে বসে দাদুর কাছে গল্প শুনতে শুনতে তারা গোনার চেষ্টা করেছি বৈকি। তবে, বড়জোর একশ’ পর্যন্ত গিয়ে হয় খেই হারিয়ে ফেলেছি বা গল্পের ছলে গোনা ভুলেছি। আর জনপ্রিয় এক গানের লাইনের মতো (” … তারার মতো, দু’ চোখে গোনা যায়না… ” ) ছোটবেলা থেকেই মনে গেঁথে আছে যে তারার সংখ্যা কি গোনা যায় নাকি আবার! হাজার থেকে লাখ – কোটি, যে কোনো সংখ্যাই হতে পারে! জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়তে এসে নানারকম হিসেব নিকেশে এই শৈশবের প্রশ্ন হারিয়ে গিয়েছিলো মাথা থেকে। গতকাল একটা লেখার জন্য তথ্য খুঁজতে গিয়ে এ প্রসঙ্গে মজার কিছু জানলাম। ভাবলাম লিখে ফেলি!    

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বদৌলতে আমরা জানি যে শুধু আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই তারা আছে দশহাজার কোটি বা একশ’ বিলিয়নের বেশি (> ১০০০০০০০০০০০)! আর দৃশ্যমান মহাবিশ্বে ছায়াপথের সংখ্যা ও প্রায় একই সমান। তাহলে প্রতিটা ছায়াপথে যদি গড়ে এর আশেপাশের সংখ্যক তারা থাকে, তবে  সব মিলিয়ে কতো অসংখ্য তারা আছে সেই অনুমানটা সহজ বোধে মাথায় আসা কঠিন। তাহলে এতো তারা কোথায় গেলো? হাজার হাজার কোটি তারা থাকলে তো আকাশটাই ছেয়ে যেতো আলোয়। আর কয়টা তারাই বা দেখি আমরা সব মিলিয়ে? এই ভীষণ সময়সাপেক্ষ আর আপাতভাবে অহেতুক প্রশ্নের উত্তরটা একেবারে খুঁটে খুঁটে সময় নিয়ে বের করে গিয়েছেন এক জ্যোতির্বিদ। আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরিট হফ্লেইট ১৯৬৪ সালে এক তারার তালিকা প্রকাশ করেন যা ‘ইয়েল ব্রাইট স্টার ক্যাটালগ’ বা ইয়েল উজ্জ্বল তারার তালিকা নামে পরিচিত। সেখানে পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান সর্বনিম্ন ৬.৫ ম্যাগ্নিচিউডের তারার তালিকায় মোট তারার সংখ্যা হয়েছে ৯০৯৬টি! তাও উত্তর – দক্ষিণ দুই গোলার্ধ মিলিয়ে। মানে, বাংলাদেশে বা যেকোনো দেশে থেকে একেবারে বিন্দুমাত্র আলো দূষণ ছাড়া কোনো জায়গা থেকে খালি চোখে রাতের আকাশ দেখলে গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার তারা দেখা সম্ভব! লাখ কোটি তারার তুলনায় সংখ্যাটা বেশ হতাশাজনক নিঃসন্দেহে। 

তবে এটা বেশ নির্ভরযোগ্য সংখ্যা। কারণ বুঝতে জানতে হবে ম্যাগ্নিচিউড ব্যাপারটা কী। এখন থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক হিপারকাস তারাদের উজ্জ্বলতা মাপার এক মাপকাঠি করে গিয়েছেন (মতান্তরে মিশরের দার্শনিক টলেমী, তবে হিপারকাসের ভাগে ভোট বেশি)। ম্যাগ্নিচিউড মানে আকার, তিনি তারার উজ্জ্বলতাকে এর আকারের সমানুপাতিক ধরে তখন খালি চোখে দেখা তারাগুলিকে উজ্জ্বলতার সাপেক্ষে ভাগ করেন। যেহেতু আমরা যেকোনো কিছু দেখি বা অনুভব করি লগারিদমিক স্কেলে, এই মাপকাঠিও লগারিদমিক। তারা যতো উজ্জ্বল, এর ম্যাগ্নিচিউড ততো কম – পরপর দুই পাঠের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ২.৫১২। অর্থাৎ ম্যাগ্নিচিউড ১ এর তারা ম্যাগ্নিচিউড ২ এর তারার থেকে প্রায় আড়াই গুন বেশি উজ্জ্বল। সেভাবে ম্যাগ্নিচিউড ১ এর তারা ম্যাগ্নিচিউড ৬ এর তারার চেয়ে প্রায় ১০০ গুন বেশি উজ্জ্বল। সেই ২০০০ বছর আগেও খালিচোখে ম্যাগ্নিচিউড ৬ এর বেশি দেখা সম্ভব ছিল না, এখন তো না ই। আর কোনো তারা অনেক বেশি উজ্জ্বল হলে এর ম্যাগ্নিচিউড হয়ে যায় ঋণাত্মক। পরিচিত বিশেষ কিছু তারার ম্যাগ্নিচিউডের মান যেমনঃ সূর্যের -২৬.৭, বীণা মণ্ডলের অভিজিৎ নক্ষত্রের ০.০, ঈগল মণ্ডলের শ্রবণার ১.০, পূর্ণ চাঁদের -১২.৭, খালি চোখে দেখা উজ্জ্বলতম তারা লুব্ধকের -১.৪৬ ইত্যাদি। ( ম্যাগ্নিচিউডের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে উজ্জ্বলতা ব্যবহার করা হয়, তবে তাতে এর ব্যাখ্যা একটু দুর্বোধ্য হয়ে যায় দেখে এতক্ষণ ইংরেজি শব্দটাতেই লিখলাম। এখন থেকে উজ্জ্বলতা লিখছি। )  

সময়ের সাথে সাথে খালি চোখের হিসেবের বদলে উজ্জ্বলতা পরিমাপের উপায় বদলেছে। এখন এর গণনা হয় প্রতি সেকেন্ডে এই তারা থেকে কয়টা আলোর কণা এসে পড়ছে টেলিস্কোপে তার হিসেবে। এই উজ্জ্বলতা আবার দুই ধরণের। যেহেতু একেক তারা একেক দূরত্বে আছে আমাদের থেকে, কাজেই অনেক বড় একটা তারা বেশি দূরে থাকলে তার উজ্জ্বলতা কম মনে হবে আপাতদৃষ্টিতে। সেক্ষেত্রে উজ্জ্বলতার এই সংখ্যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের তেমন কোনো কাজে আসবে না। উপরে দেয়া সব উজ্জ্বলতার পরিমাপ এদের আপাত উজ্জ্বলতা। তারাদের পারস্পরিক তুলনার জন্য বেশি কাজে আসে তাদের প্রকৃত উজ্জ্বলতা। তারাদের জন্য এই প্রকৃত উজ্জ্বলতার সংজ্ঞা হল, তারাটি যদি পৃথিবী আর সূর্য থেকে ১০ পার্সেক (প্রায় ৩২.৬ আলোকবর্ষ ) দূরে থাকতো, তাহলে এর আপাত উজ্জ্বলতা যা হতো, তা ই। কারো কাছে অনেকগুলো ছোটবড় নানান উজ্জ্বলতার বাতি থাকলে, সেগুলোর কোনটা বেশি উজ্জ্বল আর কোনটা কম, তা বুঝতে যদি সবগুলো বাতি জ্বালিয়ে ১০ মিটার দূরে সমান দূরত্বে রেখে তাদের উজ্জ্বলতা মাপা হয় ব্যাপারটা তেমন। এসে করে কোনটা বেশি উজ্জ্বল আর কোনটা কম, এর সাথে কোনটা কতো দূরে তার চিন্তা করতে হয়না আর। তো এই তুলনা করে লাভটা কী? সবচেয়ে সহজ আর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো দূরত্ব মাপা। যেহেতু প্রকৃত উজ্জ্বলতা বলছে যে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে এই তারা কতোটা উজ্জ্বল, আর আমরা আপাতভাবে দেখছি এই তারা কতোটা উজ্জ্বল, আর উজ্জ্বলতা দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে এর বর্গের সমানুপাতিক হারে কমতে থাকে, এই সহজ হিসেব মিলিয়ে নিলেই এই দুই উজ্জ্বলতা থেকে তারার দূরত্ব মাপা যায়। এই দূরত্ব মেপেই আমরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করতে পারছি, আবার আকাশগঙ্গার স্যাটেলাইট ছায়াপথ ছোট (আর বড়) ম্যাজেলানিক মেঘের তারাদের দূরত্ব মেপেই প্রথম আমরা বুঝতে পারি যে আকাশগঙ্গাই একমাত্র ছায়াপথ নয়, বরং মহাবিশ্বে অসংখ্য ছায়াপথ আছে। যাহোক, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে দূরত্বের আর সঠিকভাবে দূরত্ব পরিমাপের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সে ব্যাপারে আরেকদিন বিশদ বলা যাবে! 

বলছিলাম ৬.৫ উজ্জ্বলতার সীমায় মাত্র ৪০৯৬টা তারা দেখতে পারার কথা! এখন, যদি দূষণ মুক্ত আকাশের বদলে ঢাকার মতো শহরের আকাশের কথা ভাবি? শহরের নানান আলোকসজ্জা, বাতি, আর ধোঁয়াশার কারণে দৃশ্যমান তারার উজ্জ্বলতা ৬ থেকে এসব জায়গায় নেমে আসে ২.৫ এর ও নিচে। তাতে সপ্তর্ষি মণ্ডলের তারাদের চাইতে অনুজ্জ্বল কোনও তারা দেখা সম্বব হয় না। আর দুই গোলার্ধ মিলিয়ে দেখতে পারা তারার সংখ্যা নেমে আসে ৭০এ! স্টেলারিয়ামের মতো সফটওয়ার দিয়ে দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার সীমা ঠিক করে যে কেউ দেখে নিতে পারি এই উজ্জ্বল তারাদের সংখ্যা।        

আর যদি দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার সীমা আমরা বাড়িয়ে দিতে পারি টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলার দিয়ে? এদিক দিয়ে বলা যেতে পারে যে প্রকৃতি পুঁজিবাদের মতো এক নিয়ম মেনে চলে – যতো কম উজ্জ্বল আর ছোট তারা, ততো বেশি এদের সংখ্যা। তাই একটু অনুজ্জ্বল তারা দেখতে পারলেই এর সংখ্যা সূচকীয় হারে বাড়তে থাকে। ৫০ মিমি বাইনোকুলার দিয়ে প্রায় উজ্জ্বলতা ৯ পর্যন্ত দেখা যায়, এতে প্রায় দুই লাখের বেশি তারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর যদি একটা ৩ইঞ্চি টেলিস্কোপ জোগাড় করা যায়, তাহলে সুবিধাজনক জায়গায় থাকলে প্রায় ৫৩ লক্ষ তারা চোখে পড়ে। আসলে তার প্রায় অর্ধেক যেহেতু আমরা পৃথিবীর অর্ধেক অংশের আকাশ দেখছি। কিন্তু কে গুনতে যাচ্ছে!  

Dr. Dorrit Hoffleit while obtaining her degree.

শেষ করছি ডরিট হফ্লেইটের ব্যাপারে দু’কথা বলে। ১৯০৭ সালের মার্চ মাসে তাঁর জন্ম। মাত্র ২৩ বছর বয়সে হার্ভার্ড কলেজ মানমন্দিরে হ্যার্লো শেইপলীর সাথে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি, ১৯৩৮ সালে পান ডক্টরেট ডিগ্রি। সেই সময় নারী জ্যোতির্বিদের সংখ্যা ছিল নেহাতই হাতে গোনার মতো। এমন পরিবেশেও তিনি বিষম তারা, অ্যাস্ট্রোমেট্রি, আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের মতো বিষয়ে বিশ্বখ্যাত ছিলেন তাঁর কাজের জন্য। ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ থেকে অব্যাহতি নিলেও বয়স ৯০ এর কোঠায় থাকার সময়ও নিয়মিত কাজ করে গিয়েছেন। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে, তাঁর ১০০তম জন্মবার্ষিকী পালনের কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ তাঁর উজ্জ্বল তারার তালিকা। গবেষণার পাশাপাশি তিনি মেয়েদের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায় উৎসাহী করতে কাজ করেছেন। ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীর নাম আমার মনে হয় জীবন সম্পর্কে তাঁর দ্রশ্তিভঙ্গি খুব ভালভাবেই তুলে ধরে, ‘Misfortunes as Blessings in Disguise: The story of my life’। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।  

Categories
Reviews

অভাজনের মহাভারত – মাহবুব লীলেন

২৪ আগস্ট, ২০১৯

মহাভারত পড়েছি বেশ ছোটবেলায় উপেন্দ্রকিশোরের সংস্করণ, তার বেশিরভাগই মনে নেই। এর পরে একটা সম্পূর্ণ সংস্করণ পড়ার ইচ্ছে থাকলেও নানান কারণে – অকারণে হয়ে ওঠেনি। তবে টুকরো টুকরো বিবরণ বা গল্প শোনা বা পড়া হয়েছে অনেকবারই। এই বইটার নাম শুনি আমি মাত্র ১০দিন আগে। বেশ প্রশংসা শুনেই আগ্রহ করে শুরু করি, আর বইয়ের ভাষার কারণে প্রথমে বেশ হোঁচট খাই। তবে শুরুতেই নানান তথ্য আর সরাসরি ভণিতা ছাড়া দেয়া ব্যাখ্যাগুলো পড়ে ডুবে যাই বইতে বলা যায়।

কাজ আর জীবনের কারণে এখন আর আগের মতো এক বসায় টানা বই পড়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সেই দিক থেকে দেখলে অনেকদিন পর এতো কম সময়ে এমন ঘটনা আর তথ্যবহুল একটা বই শেষ করলাম। সেজন্য সমস্ত কৃতিত্ব লেখনীর। বাস্তবতা আর পৌরাণিক ছোট বড় অসংখ্য ঘটনা, কাহিনী, আর কালের স্রোতে নানান জনের স্বার্থে জমতে জমতে বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে যাওয়া এই মহা-কাহিনীকে এরচেয়ে সোজাসাপ্টা কথায় এতো গুছিয়ে লেখা মনে হয় সম্ভব না। বিশেষ করে কবে আর কীভাবে কাহিনীগুলো বা তার অংশবিশেষ বদলেছে, বিভিন্ন প্রধান চরিত্র বিশ্লেষণ, আর এ ব্যাপারে আরও জানতে চাইলে উপযুক্ত তথ্যের রেফারেন্সের ব্যাপারগুলো খুবই ভালো লেগেছে। অবশ্যই পড়ে ফেলার মতো বই, এবং পড়ার আগে অবশ্যই ভূমিকাটুকু পড়ে নিতে হবে, নাহলে এই লেখনীর মর্মই বেশিরভাগ বোঝা যাবে না।

Categories
Travel

প্যারিস কাটাকম্ব – বিচিত্র ইতিহাস আর অভিজ্ঞতা!

আগস্ট, ২০১৯

পুরো কাটাকম্ব জুড়েই এমন হাড়ের সারি। কোনো ভুতুড়ে বইয়ের মলাট খোঁজার বেশ মোক্ষম জায়গা। কিন্তু, সেখানে থাকার সময় এমন কিছু মনে হয়নি। মনে হয়েছে শুধু মানুষ!

প্রথম প্যারিস কাটাকম্বের কথা পড়ি আমি কোনো এক বইতে, খুব সম্ভবত ড্যান ব্রাউনের ‘ দ্য ভিঞ্চি কোড’  বইতেই। কিন্তু, গত সপ্তাহান্তে প্যারিস বেড়াতে যাবার প্ল্যান যখন শুরু করেছি গতমাসে, তখন এই জায়গার কথা প্রথমে একেবারেই মাথায় আসেনি। প্যারিস – বা পারী – ছোটবেলায় স্কুলের বইতে অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা ‘পারী’ ভ্রমনকথা পড়েই প্রথম মাথায় বসে যায় যে জীবনে সম্ভব হলে কোনোদিন চর্মচক্ষে দেখতে চাই শহরটা! এরপরে আঁকিবুঁকি আর বিশেষকরে রেনেসাঁ আর তার পরবর্তী সময়ের ইম্প্রেশনিজমের ব্যাপারে আগ্রহ হওয়ায় যাবার ইচ্ছা আরও বাড়েই। সময়ের ফেরে দেশে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ২০১৬ সালে ইউরোপ আসি মাস্টার্সে। দু’বছরে ইরাস্মুস প্রোগ্রামের কল্যাণে তিন দেশে (অস্ট্রিয়া, ইতালি, সার্বিয়া )  থেকে আর আশেপাশের কয়েক দেশে ঘুরেও ফ্রান্সে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। শেষমেশ পিএইচডি শুরুর প্রায় এক বছর পরে কাজের চাপে চ্যাপ্টা এক উইকেন্ডে গতমাসে হুট করেই ভাবলাম প্যারিস যাবো! তো এতো কাহিনী বলার মূল কারণ হল যে প্যারিসে আমার দেখার যায়গার তালিকা অনেকদিনে জমে উঠে বেশ বড়ই ছিল। এমনিতে গত কয়েকবছরে আমার বেড়ানোর ধরণ হয়েছে এমন যে কখনো অনেক কিছু দেখার চেষ্টা করিনা। শেষমেশ কী দেখলাম আর কী দেখলাম না মিলেমিশে মাথা ভার হয়ে থাকে আর মুগ্ধতার চেয়ে ক্লান্তির পাল্লা ভারি হয়ে যায় মনে হয়। কিন্তু, প্যারিসের ব্যাপারে এই নিয়মটা মানতে পারলাম না। একে তো অনেক অনেক কিছু দেখার, তালিকা ছোট করেও খুব কমে না,  তার উপরে আগস্ট হল ইউরোপে মানুষের বেড়াতে আসার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। অন্যান্য মহাদেশ থেকে তো বটেই, ইউরোপের নানা দেশ থেকেও প্রচুর মানুষ এসে জমা হয় এই কল্পনার মিশেলে গড়া নগরী পারী তে। ফলে সমস্ত দর্শনীয় জায়গায় উপচে পড়া ভিড় আর বিষম লম্বা লাইন। আগে থেকে কোথায় যাবো ঠিক করে টিকেট করে না গেলে দিনে একটার বেশি জায়গায় যাওয়া প্রায় অসম্ভব, আর শান্তি করে দেখার প্রসঙ্গ তো বাদ। কাজেই যাওয়া আসা মিলে আমার আর রুসলানের মোটে সাড়ে চারদিনের প্ল্যান একেবারে ঘণ্টা হিসেব না করলেও বেলা হিসেবে করে গিয়েছি প্রায়। ল্যুভর, অর্সেই গ্যালারি, ভার্সাই প্রাসাদ, আইফেল, শাঁযেলিজে বুলভার্দ, মন্মার্ত, আর্ক দ্য ত্রিওম্ফ – ইত্যাদি তো ছিলই, মনে হল একটু আলাদা কোন জায়গায় যাওয়া যায়? কিছুক্ষণ নেট ঘাঁটতেই দুটো খুবই ভালো অপশন পেয়ে গেলাম। এই কাটাকম্ব, আরেকটা প্যেরে লাশেজ সেমেটারি। দুটো জায়গাতেই শেষ পর্যন্ত গিয়েছি, আর আলাদাভাবে মুগ্ধ হয়েছি! কাটাকম্বের নাম শুনে সেই ভাসাভাসা স্মৃতি ছাড়া আর কিছু মনে পড়লো না, তাই নেট ঘাঁটতে গিয়ে পেয়ে গেলাম এক চমকপ্রদ ইতিহাস। ভাবলাম, এটা দিয়েই শুরু হোক আমার টুকটাক বেড়ানোর গল্প লেখা! 

অসুয়ারির প্রবেশ দ্বারে সাবধান বার্তা!

পারী শহরটাকে অনেকেই তুলনা করে একটা অনেক বড় সুইস চিজের টুকরোর সাথে! উপর দিকে যতোই সমতল বা হাল্কা পাহাড়ি দেখাক, একটু মাটির ভেতর দিকে নামলেই মেট্রো লাইনেরও নিচে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০ মাইল লম্বা সুরঙ্গ আছে। এই সুরঙ্গগুলি কীভাবে আসলো জানতে আমাদের প্রায় ৫৩ মিলিয়ন বছর আগে একটু ঢুঁ মেরে আসতে হবে। এখনকার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা পারীর জায়গায় তখন কেবল এক পলিমাটি জমা জলাভূমি – বা সোয়াম্প ছিল। সেই জলা সময়ের সাথে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন বছর আগে পরিণত হয় এক উষ্ণ পানির সাগরে; এখনকার ফ্রান্সের পুরো উত্তরাঞ্চল জুড়ে থাকা এই প্রাগৈতিহাসিক সাগর তাতে থাকা অসংখ্য মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী, জলা গাছ আর শ্যাওলাসহ নানান প্রাকৃতিক কারণে আর ভূমিধ্বসে আস্তে আস্তে শুকিয়ে সমতল হয়ে আসে। আর এই জমাট পলিমাটি আর জীবের দেহাবশেষ জমে হয় এক চুনাপাথরের ভাণ্ডার। অনেককাল ধরে অনাবিষ্কৃত এই ভাণ্ডার এসে কাজে লাগে রোমান সাম্রাজ্যের সময়! রোমানরা এই এলাকায় এসে প্রথমে চারপাশের পাহাড় থেকে চুনাপাথর এনে ঘরবাড়ি তৈরি করে পত্তন করে ‘লুটেশিয়া’ নামের এক নগর – যা নানান পরিবর্তন আর পরিবর্ধনের পরে হয়ে যায় আজকের পারী! পাহাড়ে জমা পাথর শেষ হয়ে গেলে তারা মাটি খুঁড়ে তুলে আনতে থাকে। এখনকার হিসেব মতে সবচেয়ে প্রাচীন মাটি খুঁড়ে পাথর বের করার নিদর্শন খৃস্টীয় প্রথম শতকের। তো রোমানরা যাবার পরে ফ্রাঙ্ক’রা এসে জোরেশোরে নগর বাড়ানোর কাজে লেগে গেলে সেই মাটিখোঁড়া খানাখন্দ বাড়তে বাড়তে হয়ে যায় মাইলের পর মাইল লম্বা সুরঙ্গ, এই বিশেষ চুনাপাথর তার মানের কারণে পায় নতুন নাম, ‘প্যারিস স্টোন’ । আর উপরে উঠতে থাকে একের পর এক বিশাল নামকরা দালান যেগুলোর অনেকগুলিই এখনো আমরা দেখি – নতর দাম ক্যাথেড্রাল, ল্যুভর প্রাসাদ, লাতিন কোয়ার্টার ইত্যাদি। এখন পর্যন্ত ও সব ঠিক ছিল। 

বরং একটু বেশিই ভালো চলছিলো সবকিছু, এই ক্রমবর্ধিষ্ণু নগরের নাম যশ বাড়ে, এ হয়ে ওঠে শিল্প-সাহিত্য-ব্যবসা সবকিছুর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। উপরে নগর বাড়ে, আর নিচে বাড়ে সুরঙ্গের দৈর্ঘ্য। প্রথমে এ সুরঙ্গ নগরের সীমানার বাইরে থাকলেও ১৭’ আর ১৮’ শতক নাগাদ শহরের সীমা এতোটাই বাড়ে যে, সুরঙ্গ শহরের নিচেই চলে আসে। আর তখনই শুরু হয় ঝামেলা। বাড়তে থাকা বাড়িঘর আর দালানের বোঝা এই ফাঁপা মাটি সইতে না পেরে বিভিন্ন জায়গায় দালান আর রাস্তা ধ্বসে পড়তে শুরু করে। ১৭৭৪ সালে রু দেফের রশের‍্যু তে প্রায় ৩০০ মিটার এলাকা ধ্বসে পড়লে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে। সেসময় সম্রাট ষোড়শ লুই ১৭৭৬ সালে আইন জারি করে যে রাস্তার নিচের কোনো খনি থেকে পাথর তোলা নিষিদ্ধ। সেই সাথে ১৭৭৭ সালে সুরঙ্গ আর খানাখন্দ আসলে কতদূর ছড়িয়ে আছে তা হিসেব করতে, আর যেসব জায়গায় ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে ভিত মজবুত করার ব্যবস্থা করতে এক বিশেষ কমিটি ও তৈরি করেন। এই কাজের দায়িত্ব পরে তার রাজস্থপতি Charles-Axel Guillaumot এর ঘাড়ে। 

হাড়ের তৈরি ব্যারেল

এই সমস্যার পাশে তখন পারীতে চলছিলো আরেক বড় সমস্যা। একে তো পয়ঃনিষ্কাসনের লাইন সব রাস্তার উপরেই, দূষিত পানি খেয়ে মানুষ নানান অসুখে ভুগছে, তার উপর শহরের কোনো কবরখানায় আর এক চিলতে জায়গা নেই। বাড়ন্ত শহরে কাজের সন্ধানে আসা অসংখ্য মানুষ মধ্যযুগের নানান অসুখবিসুখে, যুদ্ধে, প্লেগ মহামারীতে এতো বিপুল সংখ্যায় মারা গিয়েছে যে একই কবরে একের পর এক কবর দিয়ে, আবার বড় কবর খুঁড়ে গণকবর দিয়ে জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। আবার বারবার এক কবর খোঁড়া হচ্ছে দেখে লাশ পচা গন্ধে শহরের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে থাকে। এমনকি সুগন্ধির জন্য যে শহর পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত, সেখানের সুগন্ধির ব্যবসায়ীরাও সম্রাটের কাছে নালিশ জানাচ্ছে যে পাশের মাইলটাক দূরে থাকা কবরখানার গন্ধেও তাদের ব্যবসা লাটে উঠছে। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে একবছর বর্ষায় বেশ ভারী বৃষ্টি হল। তাতে এক বিশাল কবরখানার এক পাশের দেয়াল ভেঙ্গে প্রচুর আধাপচা গলে যাওয়া মরদেহ উঠে আসলো। এই ভীষণ পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্রাট বের করলেন এক সময়োপযোগী সমাধান। তা হল, এইযে সুরঙ্গর হিসেব নিকেশ হচ্ছে, এগুলো তো ফাঁকাই পড়ে আছে। এখানে পুরনো মরদেহগুলো সরিয়ে ফেললে শহরেরও গতি হয়, জায়গাগুলোও ব্যবহার হয়। সেই থেকে দু’ বছর টানা কাজ করে ১৭৮৫ সাল নাগাদ প্যারিসের সব সেমেটারি থেকে দেহাবশেষ রাতে রাতে সরিয়ে কাটাকম্বে স্থানান্তর করা হল। যেহেতু সব মরদেহ ধর্মীয় জায়গা থেকে নেয়া হচ্ছে, তাই সাথে একদন পাদ্রী থেকে এই স্থানান্তরের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেন। তবে এই সময়ে এইসব হাড়গোড় সাজিয়ে কিছু করার চিন্তা করেনি তারা, শুধু স্তূপ করেই রাখা হয়েছিলো।

১৭৮৬ সালে আনা এক কবরখানার নামফলক।

এর মধ্যে হয় ফরাসী বিপ্লব, রাজতন্ত্র হঠিয়ে নেপোলিয়ন আসে ক্ষমতায়। তার এক বিশ্বাস ছিল যে মানুষষের কীর্তির চিহ্ন তার রেখে যাওয়া স্মৃতিস্তম্ভেরাই সবচেয়ে ভালো বহন করে! আর ততদিনে ইউরোপের আরেক নামকরা নগরী রোমের কাটাকম্ব বিখ্যাত। তার মনে হলো যে প্যারিসেও এক বিখ্যাত কাটাকম্বের মনুমেন্ট হবে। এদিকে কবরখানা থেকে হাড়গোড় বা দেহাবশেষ কাটাকম্বে নিয়ে একরকম স্তূপ করে রাখার কারণে সেখানে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ ছিল। শুধু একেক কবরখানার দেহাবশেষ একেক সুরঙ্গে রেখে সেখানে ওই কবরখানার একটা ফলক রেখে আসা হতো যাতে বোঝা যায় যে কোথা থেকে এসেছে এগুলো। তো এই দুই মিলিয়ে নেপোলিয়নের নির্দেশে শুরু হয় আজকের ‘সুন্দর’ দেখতে কাটাকম্ব তৈরি! একেবারেই পচে যাওয়া হাড়গোড় আর দেহাবশেষ সরিয়ে আলাদা করে বিশেষ ভাবে রেখে বন্ধ করে দেওয়া হয় সেসব জায়গা। বাকি হাড়গোড় লাইন ধরে সাজিয়ে রাখা হয়। তাদের মাথায় ছিল যে, জায়গাটা মানুষজন দেখতে আসবে, মৃতদের আত্মীয়-পরিজন ছাড়াও সাধারণ মানুষ, শুধু স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে। সেই চিন্তা থেকে তারা বেশ অদ্ভুৎ দর্শন  হাড়-ভাস্কর্য তৈরি করে কাটাকম্ব জুড়ে। ১৮৫৯ সাল নাগাদ প্যারিসের ১৫০টা কবরখানা থেকে এখানে দেহাবশেষ এসে জমা হয়। প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষের দেহাবশেষ আছে এখানে এখন! পুরো কাটাকম্বের সবটুকু জায়গা এই কাজে লাগে না। বাকি জায়গায় হয় বিখ্যাত শ্যাম্পিনিওন দ্য পারী (বা প্যারিসের মাশরুম! ) এর চাষ, আর বিয়ার তৈরির কারখানা। এরপরেও এই ২০০ মাইল লম্বা গোলকধাঁধার অনেক অংশই আমাদের যাতায়াত সীমার বাইরে। অনেক জায়গা ধ্বসে গিয়েছে, অনেক জায়গায় বাইরে থেকে পানির স্রোত এসে বন্ধ করেছে, কিছু জায়গা সেই প্রথম ম্যাপিং এর সময়ই হিসেব করা যায়নি। কাটাকম্বের টিকেট কেটে ঢুকলে আমরা মাত্র ২ কিলোমিটার জায়গা দেখি। 

মাঝের একটুকরো প্রার্থনার জায়গা। সাথে কবরখানার নামফলক। ফলকের উপর খুলির দুচোখের ঠিক মাঝখানে এক নিখুঁত গোল গর্ত। হয়তো যুদ্ধের সময়কার বা কোনো ডুয়েলের ফল – কে জানে!

তৈরির সময় থেকেই যুগে যুগে নানান উটকো মানুষের দল কাটাকম্বকে ঘিরে নানান অদ্ভুৎ গল্প ফেঁদেছে, বেআইনি ভাবে কাটাকম্বে গিয়ে কালোজাদুর চর্চার চেষ্টা করেছে! তাই এই চমকপ্রদ জায়গা দেখতে প্যারিসের সব দর্শনার্থী না আসলেও কম আসে না! যেটুকু জায়গা দেখা যায়, প্রায় ২০ মিটারের বেশি মাটির নিচে, আর সমস্ত হাড়গোড়ের পচন ঠেকাতে নিয়ম করে কখনোই একসাথে ২০০ জনের বেশি যেতে দেয়া হয়না। আর নিচে তাপমাত্রা সবসময় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা হয়। আমরা প্যারিস গিয়ে ছিলাম সাগরদার বাসায়। উনি বললেন যে গত ৯ বছরের বেশি সময় ধরে প্যারিস থাকলেও তার কখনো যাওয়া হয়নি। কয়েকবার কেউ বেড়াতে আসলে তাদের সাথে গিয়েছেন, কিন্তু ভীষণ লম্বা লাইন দেখে আর সাহস করে যাননি। তো আমি আর রুসলান ওইদিন সকাল ৭টায় উঠে ভারসাই যাই। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে প্রায় ১২ কিলোমিটার হেঁটে ক্লান্ত অবস্থায় ফিরে ঠিক করি যে আর কবে আসবো, লাইনে দাঁড়িয়ে দেখি! প্রায় দু’ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষে যেতে পারলাম! 

ঢুকতেই পেঁচানো সিঁড়ি নেমে গিয়েছে টানা ২০ মিটারের গভীরে। আমরা ঢোকার সময় আগে যাওয়া একজন ভদ্রমহিলা উঠে আসছিলেন, উনি সিঁড়ি দিয়ে সম্পূর্ণটা নামতে পারেননি, মাথা ঘুরছিল দেখে উলটো চলে আসছিলেন! নামতে নামতে আমারও একসময় মাথা ঘুরে আসছিলো। নেমে প্রথমে কিছু সাধারণ চুনাপাথর কাটা সুরঙ্গ। একটু পরে কয়েকটা লাগোয়া ঘরের মতো জায়গা, সেখানে কয়েকটা ভাষায় কাটাকম্বের ইতিহাস লেখা, সাথে কিভাবে কবর খুঁড়ে দেহাবশেষ আনা হল, কিভাবে সনাক্ত করা হল কোনটা কার শরীরের হাড়, কিভাবে কোনটা কোন সময়ের এটা ঠিক করা হলো, এসবের বিবরণ। জানলাম যে, কোনো কোনো কবরে এমনকি ৬টা স্তরে দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে! আর সবচেয়ে বড় গণকবরে ৬ স্তর মিলিয়ে ২৩০ জন মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে! খুব সম্ভবত প্লেগ মহামারীর সময়কার এক গণকবর ছিল সেটা। এরপরে হাড়ের সুরঙ্গ বা অসুয়ারি শুরু হয় এক নামফলক দিয়ে, সেখানে লেখা,  ‘Arrête! C’est ici l’empire de la Mort’ বা ‘সাবধান! এখানে মৃতদের সাম্রাজ্য!’  ভেতরে ঢুকতেই নানান সজ্জায় হাড় দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য, মূলত ঠাসবুনটে সাজিয়ে রাখা হাড়ের সারি, মাঝে মাঝে মাথার খুলি দিয়ে আকা হৃদয়, ক্রস, বা কলাম। জায়গায় জায়গায় আবার একটু অর্ধবৃত্তাকার ফাঁকা জায়গা করে প্রার্থনার স্তম্ভ করা। মৃতদের আত্মীয়রা বা যে কেউ যাতে তাদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করতে পারে সেই ব্যবস্থা, মাটির নিচে গির্জা তো আর বানাতে পারেনা, তাই। আর প্রতিটা সারির সাথে যেই কবরখানা থেকে এগুলো এসেছে সেখানের নামফলক। শেষের দিকে এসে হাড় দিয়ে তৈরি বড় এক ব্যারেল আর কিছু চাতাল মতো ভাস্কর্য ও আছে। এগুলোর বেশিরভাগই দু’শ বছরেরও আগে করা!  

হাড়ের তৈরি হৃদয়! ঢুকতেই প্রথমদিকে এর দেখা মেলে।

জায়গাটায় রাতের অন্ধকারে একা যাবার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, এমনিতে অশরীরীর ভয় অনেক আগেই চলে গিয়েছে তারপরেও, কিছুটা গা ছমছমে অনুভূতি তো বটেই। তবে একসাথে আরও কিছু অনুভূতি কাজ করছিলো – মৃত মানুষের হাড়গোড় আর শহরের নিচের ফাঁপা জায়গার সমস্যা – এখন থেকে কয়েকশো বছর আগেও কতোটা বাস্তববাদী হলে এমন সমাধানে আসা যায়! আর সেটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে এখনো কতো সুন্দর রাষ্ট্রীয় আয় হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে দেশের অদ্ভুত ইতিহাস দেশ বিদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা যাচ্ছে। আমাদের দেশের কতো চমকপ্রদ ইতিহাস আছে নিজেরাই জানি না ঠিকমতো, গুছিয়ে দেখানো তো দূরের কথা! আরেকটা বোধ হচ্ছিলো যে, একেকটা সারিতে এইযে হাজার হাজার হাড়গোড়, প্রতিটাই কোনো না কোনো মানুষের অংশ ছিল – আমি এমন হাড়গোড় হয়েই যাবো, এমন স্মৃতিস্তম্ভের অংশ না হয়ে মাটিতে মিশে জীবন – মৃত্যুর চক্রে মিশে যাবো। কী দরকার যতদিন বেঁচে আছি, ঝামেলার পেছনে সময় নষ্ট করার। স্মৃতিরাই শুধু আমার সাথে থাকবে শেষ পর্যন্ত!  

Categories
Reviews

ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়, জসীমউদ্দীন

2016

একেবারেই একটানা পড়ে শেষ করলাম বইটা। ছোটবেলা থেকেই কবি জসীমউদদীনের মুগ্ধ পাঠক ছিলাম, এখন তাঁর গদ্যরও ভক্ত হয়ে গেলাম। যদিও এটিকে গদ্য না বলে স্মৃতিকথা বলাই যুক্তিযুক্ত। কবিগুরু এবং ঠাকুরবাড়ির আরও বেশ কিছু মানুষ, বিশেষ করে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে আসা এবং তাঁদের সাথে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ নিয়েই লেখা বইটি। 

বইটি পড়তে পড়তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন, কাজ, ও ব্যক্তিত্বকে এক নতুন আলোকে দেখতে পেলাম যেন; যেই কবি লেখা মনমতো হওয়ার আগে পর্যন্ত বারে বারে লেখার সংশোধন ও পরিবর্তন করেন, নাটক মঞ্চায়নের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংলাপ আর কাহিনীতে পরিবর্তন করতে থাকেন সবচেয়ে ভালোভাবে কাজটি করার জন্য, ভোরে উঠে সারাদিন লেখায় মশগুল থাকেন, আবার তাঁর কাছে এসে কোনো দর্শনার্থী ফিরে গেলে মনঃক্ষুণ্ণ হন, সকলের সাথে দেখা এবং কথা বলেন, সাধ্যমত সকলের জন্য করেন, আবার কেউ উপকার পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে এলে অবাক হয়ে যান। সাহিত্যের এতো দিকে তাঁর বিস্তর পদচারনা, অথচ বিশ্বভারতী আর শান্তিনিকেতনের মত বড় দুটো প্রতিষ্ঠান চালিয়ে গিয়েছেন সফলভাবে। বই থেকে জানলাম এতোরকম কাজ করতে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির বাকি সকলের এবং আরও কতজনের কতো নীরব ত্যাগ এবং অবদান ইন্ধন জুগিয়েছে। জানলাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং তাঁর আরও দুই ভাইয়ের সাধনার কথা; ছবি আঁকা নিয়ে তাঁদের দিন রাত পার করে দেয়ার গল্প। 

পড়ার সময় গুণী মানুষজনের কথা, কাজ, এবং কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়েছে, মানুষের সাথে মানুষের সৌহার্দ্য আর বাচ্চাদের মন জয়ের জন্য লেখকের চেষ্টার কথা শুনে অদ্ভুত প্রশান্তি হয়েছে, বন্ধুরা মিলে প্রতিবেশি একজনের সাথে প্র্যাক্টিক্যাল জোকের কাহিনী পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই জোরে হেসে ফেলেছি, আবার জীবনের শেষ দিকে এসে এই বাড়ির মানুষজনের দুর্দশার কথা পড়তে গিয়ে চোখ ভিজে এসেছে। 

পল্লীকবি জসীম উদদীনের লেখায় গ্রামবাংলার যে মায়াভরা রূপটা দেখতে পাই, তাঁর লেখায় যে মাটির গন্ধ পাই, সেইরকম মায়া এই বইটা জুড়েও ছিলো। একটা শহর আর শহুরে মানুষজন নিয়েও যে এমন কোমল মমতা নিয়ে লেখা যায়, এমনটা আগে দেখিনি। মিষ্টি সব উপমা, সহজ সরল মুগ্ধতার ভাষা, আর লেখাজুড়ে আপনজনকে নিয়ে লেখার মায়া যে মনের ভেতর থেকে আসা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা মিলেই গড়ে উঠেছে – তাতে সন্দেহ হবার অবকাশ নেই। লেখকের এ ধরনের আরও যে কয়টি বই রয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব পড়ে ফেলার আশা রাখি 😀

Categories
Reviews

যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা

২০১৬

অনেকদিন থেকে ‘পড়তে চাই’ লিস্টে রেখে দেয়া একটা বই। শুরুটা বেশ কয়েকদিন আগে করেছি। তবে প্রথমে একটু একটু হোঁচট খেয়েছি বলতে হবে। কেমন যেন একটু খাপছাড়া আর এক কথা কয়েকবার এসেছে মনে হয়েছিলো। তবে কয়েক পাতা পড়ার পর থেকে আর থামতে হয়নি, পারিনি বলা ভালো।

বইটা পড়তে গিয়ে যতটা না গুনমুগ্ধ হয়েছি তারচেয়ে অনেক বেশি আফসোস হয়েছে। আহা, এমন একজন মানুষের কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর এতো এতো অভিজ্ঞতা আর দর্শনের কথা যদি কিছুক্ষণের জন্যও শুনতে পেতাম, লেখক যদি আরেকটু গুছিয়ে আরও বিশদভাবে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে তার কথোপকথন লিখে রাখতেন যখন শুনতেন, ইনি ছাড়া আরও কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি জানতে পারতাম এই অসাধারণ জ্ঞানী এবং গুণী মানুষটার কথা! – এবং আরও অনেক আফসোস। বইতে একটা জায়গায় আছে, একদিন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন স্যারের বাসায় আসবেন এই উপলক্ষে তাঁর বাসায় নানান আয়োজন হয়। সেসময় লেখককে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রান্নাবান্নার ধরণ এবং তার কারণ সম্পর্কে অনেক কিছু বলেন; কিন্তু লেখকের নিজের রান্নাবান্না সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞতা বা আগ্রহ কোনোটাই না থাকায় তিনি তার প্রায় সবটাই ভুলে গিয়েছেন। পুরো বইটাতে এই অংশে আরও কি কি লেখা থাকতে পারতো ভেবে যে আফসোস হয়েছে, এরকম আর হয়নি বলা যায়। এরকম অমূল্য কথাগুলো এভাবে হারিয়ে গেলো!

লেখক নিজেই বলেছেন যে, অধ্যাপকের কথা বা তাঁর চরিত্রকে একেবারে সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা হয়তো সম্ভব হয়নি স্মৃতি থেকে লেখার কারণে। তারপরেও, বিভিন্ন ঘটনা আর বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মন্তব্য যা পড়েছি এখানে, এতেই তাঁর জ্ঞানের পরিধি, প্রজ্ঞা, আর চারিত্রিক গুণের কথা ভেবে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অথচ তেমন কিছুই জানতাম না এঁর ব্যাপারে বইটা পড়ার আগে! বইটা পড়তে গিয়ে তাঁদের কথাবার্তায় উঠে আসা নামগুলো থেকে অনেকগুলো বই আর লেখকের নাম টুকে রেখেছি, সম্ভব হলে অবশ্যই পড়ে দেখতে চাই এমন সব বই।

কোথায় যেন পড়েছিলাম যে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে এক ঘণ্টা বসে থেকে তাঁর কথা শোনা একশ’ বই পড়ার চেয়ে বেশি জানায় ও ভাবায়। বস্তুতই এমন মানুষের দেখা পাওয়া ভার। কোনো এক বিষয়ে অনেক জানেন এমন মানুষ থাকলেও বিবিধ বিষয়ে পারদর্শী মানুষ যেমন পাওয়া কঠিন, তেমনি অনেক জানেন কিন্তু শ্রদ্ধা করার মত চরিত্রর দেখা পাওয়া আরও কঠিন। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কথা থেকে নিয়ে বলা যায়, ” বড় লেখকদের মধ্যে বড় মানুষের ছায়া থাকে। বড় মানুষেরা আসলেই বড় মাপের মানুষ।” সেদিন থেকে তাঁর মানুষের গুণের যথার্থ কদর, যার প্রয়োজন তাকে যথার্থ সাহায্য করা, সর্বোপরি উপকার পেয়ে পরে ভুলে যাওয়া মানুষের প্রতি কোনো তিক্ত মনোভাব পুষে না রাখার যে দৃষ্টান্ত দেখেছি তাতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়।

বইয়ের শুরুতে একটু আটকে গেলেও পরে যে আর থামতে পারিনি, তা যেমন লেখনীর গুণ, তেমনি বিষয়ের। এতো ছোট পরিসরের একটা বইতে কত বিষয় আর কত মানুষ সম্পর্কে যে কতো কিছু জানতে পারলাম তা ভেবে কূল পাচ্ছি না আপাতত। লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করছি যার জন্য কিছুটা হলেও এমন একজন ব্যক্তিত্বের কথা জানতে পারলাম।

Categories
Reviews

ভোল্‌গা থেকে গঙ্গা, রাহুল সংকৃত্যায়ন

August, 2016

অনেকদিন সময় নিয়ে পড়লাম বইটা। যেকোনো বয়সের পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য মনে হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত এলাকার মানুষজনের জন্য। ৬০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে বর্তমান সময়ে এই উপমহাদেশের আশেপাশের এলাকায় সভ্যতা আর সমাজ কীভাবে এগিয়েছে সেটাই একটার পর একটা সময়ের মানুষের গল্প দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ মানুষ বা সমাজপতিদের ব্যক্তিগত জীবন আর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই ফুটে উঠেছে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া ঘটনাপ্রবাহ আর দর্শন। কীভাবে মানুষ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে মানুষের অনুভূতি বা ধর্মবিশ্বাসকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করেছে তারও একটা পরিষ্কার ছবি চোখে ভাসে। স্কুলে থাকলে সমাজবিজ্ঞান বইতে ইতিহাসের যে অংশগুলো ছিলো তার বদলে ষষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত এই বইয়ের অংশবিশেষ করে পড়লে ইতিহাস আরও অনেক সুন্দরভাবে জানতে আর বুঝতে পারতাম মনে হয়েছে। 

বইটায় দুইটা অংশ আছে। ‘ভোল্গা থেকে গঙ্গা’ আর ‘কনৈলা কি কথা’। প্রথম অংশে সমগ্র ইন্দো-ইউরোপীয় এলাকা নিয়েই কথা এসেছে আর দ্বিতীয় অংশে কনৈলা বা কর্ণহট আর শিশংপা নামক জায়গার আশেপাশের এলাকার ইতিহাস। লেখা খুবই সুখপাঠ্য। তবে প্রথমদিকে পড়তে গিয়ে আটকাতে হয়েছে। এই জন্যেই পড়তে সময় নিয়েছি। তবে সেটা লেখার সীমাবদ্ধতা নাকি অনুবাদের, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আসে। অনুবাদ বেশীরভাগ জায়গাতেই সাবলীল ও ঝরঝরে। তবে কিছু কিছু জায়গায় কেমন ‘আক্ষরিক’ অনুবাদ হয়েছে বলে মনে হয়। সেটা পাঠক হিসেবে আমার সীমাবদ্ধতাও হতে পারে। 

তারপরেও সব মিলিয়ে আসাধারণ বই এটি। সময় নিয়ে হলেও সবার পড়ে দেখা উচিৎ। এতো বিশাল পরিসরের এতো রকম ঘটনা সবটা মনে না থাকলেও সবমিলিয়ে এই উপমহাদেশের যে ছবিটা চোখের সামনে ফুটে উঠেছে বইটা পড়ে, আর কোনো বই পড়েই এমন হয়নি 🙂 

Categories
Reviews

আগুনপাখি, হাসান আজিজুল হক

মার্চ, ২০১৬

অনেক অনেকদিন পর মোটামুটি এক নিঃশ্বাসে একটা বই পরে ফেললাম। ছোটবেলায় গ্রামে যখন ছিলাম, সন্ধ্যে হলেই কিছুক্ষণ নামেমাত্র পড়াশোনা করে দাদুর কাছে বসে যেতাম আমরা দুই ভাইবোন। বেশিরভাগ সময়েই লোডশেডিং চলতো আর উঠোনে খোলা আকাশের নিচে বসে হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে আমরা শুনতাম দাদুর জীবনের গল্প- কিভাবে বরিশালের মশাং নামক এলাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে মাত্র দশ বছর বয়েসে বিয়ে করে এই সংসারে এলো- কিভাবে অনেক দিন পর্যন্তই এই বড় বাড়িতে মন খারাপ করেই তার সময় কেটে যেত- কিভাবে সে কোনও কাজ না জেনে এলেও সময়ের সাথে সব শিখে সংসারের হাল ধরলেন – কিভাবে সংসারের ভালো মন্দ সময়গুলো গেলো- কখন একেকটা অসময়ের মৃত্যু এসে জীবনটা ওলট পালট করে দিলো- কিভাবে তারপরেও জীবন এগিয়ে গেলো- কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময়টা তারা পার করলেন- এমন হাজারও জীবনের গল্প শুনতে শুনতে ছোটবেলায় কোথায় যে হারিয়ে যেতাম! একটু বড় হবার পর থেকেই তাই মাথায় ঘুরছে যে তার এই সব গল্প- সবকিছু যেভাবেই হোক লিখে ফেলতে হবে। পৃথিবীতে কত কি হয়ে যায়- তার প্রভাব একেবারেই কারও সাতে-পাঁচে না থাকা নিরীহ মানুষের জীবনে কিভাবে আন্দোলন বয়ে আনে, তা সত্যিই স্তব্ধ করে দেয় সময়ে সময়ে। আগুনপাখি বইটি পড়ে মনে হচ্ছিলো আমার দাদুর গল্পই যেন পড়ছি!

গাঁয়ের এক সাধারণ মেয়ের জবানিতে লেখা তার জীবনের বিভিন্ন সময়ের গল্প। তার বাবার বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে আসার গল্প। বিরাট সংসারে ছায়া দিয়ে যাওয়া মানুষদের কথা মেনে নিয়ে যা আছে তাই নিয়ে হাসিমুখে পার করে দেয়া সময়ের গল্প। এর মাঝেই জন্ম- মৃত্যু – হাসি – কান্না মিলে জীবন এগিয়ে যায়। পুরো বইটা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল মাটির গন্ধ আর একমাত্র মায়ের মনেই থাকা সম্ভব এমন মায়া। কোনও কিছুই মুখফুটে না বললেও যে মানুষ তার পরিবারের মানুষগুলোর সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম অকপটে বুঝে নিয়ে নিজের সর্বস্ব দিয়ে যাচ্ছে তাকে ভালো না বেসে কি পারা যায়! তাই বইটি পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই কখনো হেসে কুটিকুটি হয়েছি, কখনো বুক ভেঙ্গে যেতে চেয়েছে হাহাকারে। বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ছাড় আন্দোলন, দেশ বিভাগ, মঙ্গা- এসবকিছুকেই একেবারে আটপৌরে জীবনের কাছ থেকে দেখতে পেলাম যেন। আর শেষে এসে এই সর্বংসহা সরল মেয়ের জীবনে একবার অবাধ্য হবার সময়ও তাই তাকে সমর্থন না জানিয়ে পারলাম না। অসাধারণ বই!

Categories
Astrophysics

উল্কা আর উল্কাবৃষ্টি

গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রাতের আকাশে একটা ছোট আলোর বিন্দু হঠাত করে নিচের দিকে পড়ে যেতে আমরা অনেকেই দেখেছি। মনে হয় যেন আকাশ ভরা মিটমিটে তারাগুলো থেকে একটা বুঝি টুপ করে পড়ে গেল! এব্যাপারে বড়দের জিজ্ঞাসা করে এগুলো যে ‘খসে পড়া তারা’-ই, তাও হয়ত শুনেছি অনেকে। আবার এই ‘খসে পড়া তারার’ মত দেখতে জিনিসগুলি যে আদতে তারাই নয়, বরং এদের নাম ‘উল্কা’ তা-ও কেউ কেউ জানি। কিন্তু ‘উল্কা’ জিনিসটা আসলে কি অথবা উল্কাবৃষ্টি আসলে কেন হয়? আর কেনইবা উল্কাদের খসে পড়া তারার মত দেখায় এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তরগুলি আমাদের অনেকের কাছেই কিছুটা ধোয়াটে।

উল্কার সংজ্ঞাটা বেশ সাদাসিধা। কোনো মহাজাগতিক বস্তু(সহজ কথায় যেসব বস্তু মহাকাশে ঘুরে বেড়ায়) পৃথিবীর যথেষ্ট কাছে এসে পড়লে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের প্রভাবে এটি ভূপৃষ্ঠের দিকে তীব্র বেগে এগুতে থাকে আর এসময় এর সাথে বায়ুমণ্ডলের কণাগুলোর সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। তখন যে ক্ষণস্থায়ী সরু আলোর রেখা দেখা যায়, তা-ই উল্কা। বেশিরভাগ সময়ই উল্কার আকার এত ছোট হয় যে এটি আসার পথেই জ্বলে ছাই হয়ে যায়। যদি এটি মোটামুটি বড় আকারের হয় তবে এর যে অবশিষ্টাংশ ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে তা হল উল্কাপিণ্ড।

কথা হল, কোন মহাজাগতিক বস্তু আসে এমনভাবে? পৃথিবীর চারপাশে শুক্র বা মঙ্গলের আগে পর্যন্ত তো তেমন কিছুই নেই, তাহলে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে প্রতি ঘণ্টায়ই যে গড়ে ৫টি উল্কাপাত দেখা যায়, তার উৎপত্তি কোথায়? উত্তর হল- অনেক জায়গাতেই! আসল কথা হল, সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট পরিচিত সদস্য গ্রহাণুগুলোও পৃথিবীর বেশ দূরে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু, এগুলো ছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট বালুকণা বা পাথরের টুকরোর মত পদার্থ ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। আর মোটামুটি সিংহভাগ উল্কাই এসব কণার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জ্বলে ওঠার দৃশ্য। তাই এদের কেউই পৃথিবী পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। প্রতি ১০০ বছরে হয়ত মাত্র কয়েকটি ছোট খাটো টুকরো পৃথিবী পর্যন্ত এসে পৌঁছে আর এখানে এসে বিশালাকার খাদ কিংবা ডাইনোসরদের বিলুপ্ত করে দেবার মত ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী উল্কা আসার সম্ভাবনা মোটামুটি প্রতি ৩লক্ষ বছরে একবার মাত্র। এগুলো হল গ্রহানু বেল্টের কোনো বিক্ষিপ্ত সদস্যর কাজ যেটি ঘুরতে ঘুরতে মঙ্গল ও পরে পৃথিবীর আকর্ষণে পথ বদলাতে গিয়ে শেষমেশ পৃথিবীর মহাকর্ষ বল এড়াতে না পেরে এখানে আছড়ে পড়ে।

সাধারনত, ভোরের দিকে সন্ধ্যার চেয়ে বেশি উল্কা দেখা যায়। কারণ, সেসময় পৃথিবীর গতির দিকেই উল্কাদের অবস্থান হয়। খালি চোখে আমরা যেসব উল্কা দেখি সেগুলো প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উপরে থাকে আর এদের বেগ থাকে প্রায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার/সেকেন্ড।

এ তো গেল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া উল্কার কথা। এখন আসি উল্কাবৃষ্টিতে। প্রতি বছরই কিছু নির্দিষ্ট দিনে আকাশে উল্কার পরিমান বেশ বেড়ে যায় (প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০/৪০ টি)- একেই বলে উল্কাবৃষ্টি। আর এই অসংখ্য উল্কা আকাশের একেকটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই আসে। এই জায়গাগুলিকে বলে বিকিরণ বিন্দু বা ‘radiant’। এ থেকে মনে আসতেই পারে যে এগুলো নিশ্চয়ই একই মাতৃবস্তু থেকে আসছে; আসলেও তাই। সূর্যের কাছে যে সকল ধূমকেতু আসে সেগুলোর বিশাল আর সুবিস্তৃত বরফকণাপূর্ণ গ্যাসীয় লেজের যেসব অবশিষ্টাংশ এদের কক্ষপথের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকে, পৃথিবী তার চলার পথে এদের কাছে চলে আসলে মোটামুটি কাছাকাছি অঞ্চল থেকে এরা উল্কা হয়ে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। এভাবে একেকটি ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণার দঙ্গল থেকেই বেশিরভাগ উল্কাবৃষ্টি হয় বলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে একেকটি উল্কাবৃষ্টি হয়। আর এই নির্দিষ্ট বিন্দুগুলো মূলত আকাশের পটভূমিতে একেকটি তারামণ্ডলের মধ্যে থাকে। তাই অবস্থান সনাক্তকরণ সহজ করতে একেকটি উল্কাবৃষ্টি যে তারামণ্ডলের পটভূমিতে হয়- তার নামকরণ সেই তারামণ্ডলের নামানুসারে হয়। এসময় সেই মণ্ডলের নামের শেষে সাধারনত –ids অথবা –nids যোগ করা হয়। অনেক সময় মণ্ডলের নামের শেষের দু-একটা বর্ণ বাদ দিয়েও শেষাংশ যোগ করা হয়। যেমনঃ আগস্টের ১২ তারিখে যে উল্কাবৃষ্টি দেখা যায় তার নাম ‘পারসেইডস’ (perseids)উল্কাবৃষ্টি যেটির নামকরণ হয়েছে পারসিয়াস তারামণ্ডল থেকে আর এটি হয় ‘সুইফট টাটল’ নামক ধূমকেতুর অবশিষ্টাংশ থেকে। অক্টোবর মাসের ২০ তারিখে দেখা যায় ‘ওরায়নিডস’ (orionids) নামক উল্কাবৃষ্টি যেটির নামকরণ আর কারণ যথাক্রমে কালপুরুষ মণ্ডল আর হ্যালির ধূমকেতুর অবশিষ্ট। নিচের ছকে বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উল্কাবৃষ্টির নাম ও সময় দেওয়া হলঃ

নাম —সর্বোচ্চ উল্কাপাতের দিন (সাধারণত)

কোয়াড্রানটিডস (Quadrantids) —জানুয়ারী ৩

লাইরিডস (Lyrids) —এপ্রিল ২১

ইটা অ্যাকুয়ারিডস (Eta Aquarids) — মে ৫

পারসেইডস (Perseids) —আগস্ট ১২

ওরায়নিডস (Orionids) —অক্টোবর ২০

লিওনিডস (Leonids) —নভেম্বর ১৭

জেমিনিডস (Geminids) —ডিসেম্বর ১৩

এই দিনগুলিতে বা তার একদিন আগে-পরের দিনে ঢাকার মত আলো-দূষণময় শহরগুলি ছাড়া অন্য যেকোনো জায়গাতেই থাকো না কেন, রাতের আকাশে ঘন্টাখানেক তাকালে ৩০/৪০টা না হলেও, অন্ততপক্ষে ৫/১০টা উল্কা চোখে পড়বেই। আর ভাগ্য ভালো হলে একসাথে কয়েকটাও দেখা যায় মাঝে মাঝে। ব্যাখ্যা জানা থাকুক আর নাই থাকুক, তারাভরা আকাশ দেখা যেমন মজার, উল্কা, ধূমকেতু, গ্রহণের মত মহাজাগতিক ঘটনা দেখা আরও বেশিই মজার। তাই এসব সময় উপযুক্ত জায়গায় থাকলে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ফেলাই ভালো। আর সেই সাথে ব্যাপারটা কি আর কেনো হচ্ছে তা জানা থাকলে তো কথাই নেই!     

দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা ২০১৫ সালের। এটাও কোনো ম্যাগাজিন বা শিশু সংকলনের জন্য লেখা। পুরনো লেখাগুলি জড়ো করে রাখতেই রেখে দিচ্ছি এখানে।

Categories
Astrophysics

তারাদের ঝাড়ু

আমার নানুবাড়ির গ্রাম সবচেয়ে কাছের শহর থেকেও মোটামুটি বেশ দূরে হওয়ায় সেখানে কিছুদিন আগেই মাত্র বিদ্যুৎ লাইন পৌঁছে। তাই ছোটবেলা থেকেই কালেভদ্রে সেখানে বেড়াতে গেলে শহরের একেবারেই উল্টো প্রকৃতি আর জীবন-যাপনের প্রতি একধরনের কৌতূহল মেশানো মুগ্ধতা সবসময়ই কাজ করত। আর সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করত রাতের আকাশ। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সেখানে সন্ধ্যার পরই ঝুপ করে রাত নেমে আসত। কেরোসিনের বাতি আর হ্যারিকেনের মৃদু হলদে আলোয় সে অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে উঠত। এই পটভূমিতে তারাভরা আকাশটাকে মনে হত বুঝি সত্যিকারের হীরের টুকরো দিয়ে সাজানো। সেখানেই মায়ের কাছে প্রথম আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেনা, মনে মনে তারা জোড়া লাগিয়ে সপ্তর্ষিমন্ডলের প্রশ্নবোধক চিহ্ন খুঁজে বের করা– – আর সেখানেই আমার জীবনে প্রথম এবং সবচেয়ে সুন্দর ধূমকেতুটি দেখা। অনেক পরে যার নাম জেনেছি ‘হেল-বপ’ (Hale-Bopp) যা ১৯৯৭ সালের গোড়ার দিকে নিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থায় ছিল। 

এখনো মনে আছে, দিগন্তের কিছু উপরে ছোট্ট একটা আলোর ঝাড়ু–র মত তারা দেখে কতটা কৌতূহল জেগেছিল মনে। কিন্তু সেই কৌতূহল মিটতে অনেক সময় লেগেছে। ধূমকেতু আসলে কী, এর উৎপত্তি কোথায় আর কেন – এরকম প্রশ্নগুলোর উত্তর একটু একটু করে জেনেছি। ‘ধূমকেতু’ কথাটা শুনলে তোমাদের মনেও নিশ্চয়ই এরকম প্রশ্নগুলো আসে, তাই না? তাহলে ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক!

‘ধূমকেতু’ – শব্দটার আক্ষরিক অর্থ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘ধোঁয়ার নিশান’। আবার এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Comet’ এসেছে গ্রীক শব্দ ‘Kometes’ থেকে যার বাংলা অর্থ বলা যায় ‘লম্বা চুলের তারা’। দু’টি নামেই পাওয়া যায় ধূমকেতুর ঔজ্জ্বল্য আর একটা ‘লেজের’ মত অংশের আভাস। আসলেও তাই। লেজের আকারের জন্য ধূমকেতু দেখতে শলার ঝাড়–, ধোঁয়ার পতাকা কিংবা লম্বা চুলের ঝুঁটি – নানারকমই মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুটা শক্তিশালী দূরবীনে দেখে যদি আমরা এর গঠন বুঝতে চাই, তাহলে মোটামুটি তিনটি অংশই পাওয়া যাবে। সেগুলো হল – নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রকণা (Nucleus), এটিকে ঘিরে থাকা ধূমকেতুর সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ কোমা (Coma) আর একটি বেশ বড়োসড়ো লেজ (Tail)। এগুলোর মধ্যে কেন্দ্রকণাই এর মূল স্থায়ী অংশ। বাকি দুটো কিছু বিশেষ সময়েই তৈরী হয় আর কেবল তখনই আমরা এদের দেখতে পাই। কেন্দ্রকণার আকার বেশ ছোট (কয়েকশ’ মিটার থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত)। এর প্রায় অর্ধেক উপাদানই হল ধূলো, বালুকণা বা ছোট পাথরের টুকরো। আর বাকি উপাদান হল পানি, অ্যামোনিয়া আর মিথেনের বরফ। এছাড়া সামান্য পরিমানে গ্যাস বা উদ্বায়ী পদার্থ থাকতে পারে। তাই নিউক্লিয়াসকে বলা হয় ‘নোংরা বরফের গোলা’ বা ‘Dirty snow ball’।এই গোলাটি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের মত একটা নির্দিষ্ট পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এভাবে চলতে গিয়ে এটি সূর্যের মোটামুটি কাছে (প্রায় পৃথিবীর থেকে দূরত্বের তিন গুণ) চলে আসলে এর কোমা বোঝা যায়। কোমাটি মূলত ধূলোবালির তৈরি যা ধূমকেতুর গতির কারনে এর কেন্দ্রকণার আশেপাশে ছড়িয়ে পরে। আর লেজটা প্রায় ১০,০০,০০০কি.মি. থেকে তার ১০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। ধূলোর তৈরি লেজের রঙ হয় হলদেটে আর আয়নিক কণার তৈরি হলে তার রঙ হয় অনেকটা নীলচে।  

লেজটা আসলে কেন হয়? ধূমকেতুতে যেহেতু প্রচুর বরফ থাকে, সূর্যের কাছাকাছি আসলে এগুলো গলতে শুরু করে। সূর্যের দিকে (বা বিপরীতে) ধূমকেতুর গতির কারনে এর গতির উল্টো দিকে এই গলে যাওয়া পদার্থকণাগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে লেজের মত অংশ তৈরি করে। আর সূর্যের আলো এই পুরো অংশে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে বলেই আমরা এত অদ্ভুত সুন্দর আকারের মহাজাগতিক বস্তুটি দেখি।  ধূমকেতুটির সূর্যকে ঘিরে ঘুরবার পথটি কত বড় তার উপর নির্ভর করে এটি কতদিন পরপর পুরো পথটি ঘুরে আবার সূর্যের কাছে আসবে, অর্থাৎ আমরা দেখতে পাবো। তার উপর ভিত্তি করে ধূমকেতুকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। স্বল্পমেয়াদী- যেগুলো মোটামুটি ২০০ বছরের মধ্যেই ফিরে আসে; আর দীর্ঘমেয়াদী – যেগুলো ঘুরে আসতে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত লাগে। 

আচ্ছা! ধূমকেতু কি, কেমন বা কতরকম তা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু কোথা থেকে আসে এগুলো? দুটি বিশাল এলাকায় মূলত এদের অবস্থান। কুইপার বেল্ট আর ঊর্ট মেঘ।সৌরজগতের সীমানা অর্থাৎ নেপচুনের পর থেকে প্রায় সূর্য থেকে নেপচুনের সমান দূরত্বের ব্যাসের এলাকা জুড়ে অসংখ্য বরফময় গ্রহাণুর মত ছোট ছোট বন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ অঞ্চলকে আবিষ্কারকের নামানুসারে বলা হয় কুইপার বেল্ট। এই সীমানার বাইরে আরও অনেক অনেক দূরে(সৌরজগতের সীমানার প্রায় হাজারগুণ) সম্পূর্ণ সৌরজগতকে ঘিরে এমনই বরফময় খন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঘের গোলকের মত। এর নাম ঊর্ট মেঘ। এই দুই অঞ্চলের বস্তুগুলোই মূলত ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস। বিভিন্ন কারনে এদের উপর কার্যকর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তারতম্যের কারণে এগুলো থেকে দু’একটি করে হঠাত হঠাত সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের আওতায় পরে যায় আর এগিয়ে আসতে থাকে সৌরজগতের দিকে। সৌরজগতের সীমানায় বৃহস্পতি বা শনির মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে এগুলোর গতিপথ আরও ছোট হয়ে যায়। এগুলো স্বল্পমেয়াদী। আর বাকি ধূমকেতুগুলো রয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদী-ই। এই সবরকম কেন্দ্রকণাই চলতে চলতে সূর্যের কাছে এসে প্রথমে গলে-ছড়িয়ে সৃষ্টি করে কোমা যার একটা অংশ তৈরি করে লেজ। আর সূর্যের আলোর প্রতিফলনে এই নোংরা বরফের গোলাই দৃষ্টিনন্দন ধূমকেতু হয়ে আমাদের মুগ্ধ করে, ভাবায়, কৌতূহলী করে তোলে।

গড়ে প্রতি বছর ছয়টির বেশি ধূমকেতু নতুন আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু খালিচোখে দেখার মত বড় আর নিকটবর্তী ধূমকেতু আছে কমই। এরকম কয়েকটি বিখ্যাত ধূমকেতু হলঃ হ্যালির ধূমকেতু, হেল-বপ, কোহুতেক, শ্যুমেকার, আইসন, লাভজয়, হায়াকুতাকে ইত্যাদি। 

অনেক তো জানা হল। এখন রাতের আকাশে কখনো ঝাড়ুর মত কিছু দেখলে ভড়কে না গিয়ে বরং এটির গলে যাওয়া বরফের গঠন আর দূর-দূরান্ত পাড়ি দিয়ে আসার গল্প শুনিয়ে সবাইকে চমকে দিতে পারবে না? আশা করছি, অবশ্যই পারবে!   

দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা ২০১৪ সালের। চন্দ্রাবতী একাডেমীর শিশু সংকলনের জন্য লিখছিলাম খুব সম্ভবত, মনে নেই। যেহেতু এই ওয়েবসাইট করার একটা মূল উদ্দেশ্য হল আমার টুকটাক লেখালেখিগুলো এক জায়গায় রাখা, সাথে অভ্যাসটাও বাঁচানোর চেষ্টা – তাই প্রথমেই আগের কিছু লেখা পোস্ট করে রাখছি।