Categories
Astrophysics Knowledge

আজি কতো তারা তব আকাশে?

ছোটবেলা থেকে বড় শহরের বাইরে কখনো না গেলে রাতের আকাশে আকাশগঙ্গা ছায়াপথে হাল্কা মেঘের মতো ছড়িয়ে থাকা তারাদের আলোর দিকে তাকিয়ে যে হাহাকার আর মুগ্ধতা একসাথে তৈরি হয়, তা কল্পনা করাও সম্ভব না। গ্রামের বাড়িতে, বা পাহাড়ে বেড়াতে গেলে শহরের আলো দূষণের বাইরে প্রায় জমাট কালো অন্ধকারে চাঁদহীন রাতে তারাদের আলোর প্রাচুর্য হঠাত দেখলে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। এমন কাব্যিক পরিবেশেও অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, যে আসলে কতোগুলি তারা আছে আকাশে? 

আমি নিজে ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে রাতে লোডশেডিঙের সময় মাদুরপেতে বসে দাদুর কাছে গল্প শুনতে শুনতে তারা গোনার চেষ্টা করেছি বৈকি। তবে, বড়জোর একশ’ পর্যন্ত গিয়ে হয় খেই হারিয়ে ফেলেছি বা গল্পের ছলে গোনা ভুলেছি। আর জনপ্রিয় এক গানের লাইনের মতো (” … তারার মতো, দু’ চোখে গোনা যায়না… ” ) ছোটবেলা থেকেই মনে গেঁথে আছে যে তারার সংখ্যা কি গোনা যায় নাকি আবার! হাজার থেকে লাখ – কোটি, যে কোনো সংখ্যাই হতে পারে! জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়তে এসে নানারকম হিসেব নিকেশে এই শৈশবের প্রশ্ন হারিয়ে গিয়েছিলো মাথা থেকে। গতকাল একটা লেখার জন্য তথ্য খুঁজতে গিয়ে এ প্রসঙ্গে মজার কিছু জানলাম। ভাবলাম লিখে ফেলি!    

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বদৌলতে আমরা জানি যে শুধু আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথেই তারা আছে দশহাজার কোটি বা একশ’ বিলিয়নের বেশি (> ১০০০০০০০০০০০)! আর দৃশ্যমান মহাবিশ্বে ছায়াপথের সংখ্যা ও প্রায় একই সমান। তাহলে প্রতিটা ছায়াপথে যদি গড়ে এর আশেপাশের সংখ্যক তারা থাকে, তবে  সব মিলিয়ে কতো অসংখ্য তারা আছে সেই অনুমানটা সহজ বোধে মাথায় আসা কঠিন। তাহলে এতো তারা কোথায় গেলো? হাজার হাজার কোটি তারা থাকলে তো আকাশটাই ছেয়ে যেতো আলোয়। আর কয়টা তারাই বা দেখি আমরা সব মিলিয়ে? এই ভীষণ সময়সাপেক্ষ আর আপাতভাবে অহেতুক প্রশ্নের উত্তরটা একেবারে খুঁটে খুঁটে সময় নিয়ে বের করে গিয়েছেন এক জ্যোতির্বিদ। আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরিট হফ্লেইট ১৯৬৪ সালে এক তারার তালিকা প্রকাশ করেন যা ‘ইয়েল ব্রাইট স্টার ক্যাটালগ’ বা ইয়েল উজ্জ্বল তারার তালিকা নামে পরিচিত। সেখানে পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান সর্বনিম্ন ৬.৫ ম্যাগ্নিচিউডের তারার তালিকায় মোট তারার সংখ্যা হয়েছে ৯০৯৬টি! তাও উত্তর – দক্ষিণ দুই গোলার্ধ মিলিয়ে। মানে, বাংলাদেশে বা যেকোনো দেশে থেকে একেবারে বিন্দুমাত্র আলো দূষণ ছাড়া কোনো জায়গা থেকে খালি চোখে রাতের আকাশ দেখলে গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার তারা দেখা সম্ভব! লাখ কোটি তারার তুলনায় সংখ্যাটা বেশ হতাশাজনক নিঃসন্দেহে। 

তবে এটা বেশ নির্ভরযোগ্য সংখ্যা। কারণ বুঝতে জানতে হবে ম্যাগ্নিচিউড ব্যাপারটা কী। এখন থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক হিপারকাস তারাদের উজ্জ্বলতা মাপার এক মাপকাঠি করে গিয়েছেন (মতান্তরে মিশরের দার্শনিক টলেমী, তবে হিপারকাসের ভাগে ভোট বেশি)। ম্যাগ্নিচিউড মানে আকার, তিনি তারার উজ্জ্বলতাকে এর আকারের সমানুপাতিক ধরে তখন খালি চোখে দেখা তারাগুলিকে উজ্জ্বলতার সাপেক্ষে ভাগ করেন। যেহেতু আমরা যেকোনো কিছু দেখি বা অনুভব করি লগারিদমিক স্কেলে, এই মাপকাঠিও লগারিদমিক। তারা যতো উজ্জ্বল, এর ম্যাগ্নিচিউড ততো কম – পরপর দুই পাঠের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ২.৫১২। অর্থাৎ ম্যাগ্নিচিউড ১ এর তারা ম্যাগ্নিচিউড ২ এর তারার থেকে প্রায় আড়াই গুন বেশি উজ্জ্বল। সেভাবে ম্যাগ্নিচিউড ১ এর তারা ম্যাগ্নিচিউড ৬ এর তারার চেয়ে প্রায় ১০০ গুন বেশি উজ্জ্বল। সেই ২০০০ বছর আগেও খালিচোখে ম্যাগ্নিচিউড ৬ এর বেশি দেখা সম্ভব ছিল না, এখন তো না ই। আর কোনো তারা অনেক বেশি উজ্জ্বল হলে এর ম্যাগ্নিচিউড হয়ে যায় ঋণাত্মক। পরিচিত বিশেষ কিছু তারার ম্যাগ্নিচিউডের মান যেমনঃ সূর্যের -২৬.৭, বীণা মণ্ডলের অভিজিৎ নক্ষত্রের ০.০, ঈগল মণ্ডলের শ্রবণার ১.০, পূর্ণ চাঁদের -১২.৭, খালি চোখে দেখা উজ্জ্বলতম তারা লুব্ধকের -১.৪৬ ইত্যাদি। ( ম্যাগ্নিচিউডের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে উজ্জ্বলতা ব্যবহার করা হয়, তবে তাতে এর ব্যাখ্যা একটু দুর্বোধ্য হয়ে যায় দেখে এতক্ষণ ইংরেজি শব্দটাতেই লিখলাম। এখন থেকে উজ্জ্বলতা লিখছি। )  

সময়ের সাথে সাথে খালি চোখের হিসেবের বদলে উজ্জ্বলতা পরিমাপের উপায় বদলেছে। এখন এর গণনা হয় প্রতি সেকেন্ডে এই তারা থেকে কয়টা আলোর কণা এসে পড়ছে টেলিস্কোপে তার হিসেবে। এই উজ্জ্বলতা আবার দুই ধরণের। যেহেতু একেক তারা একেক দূরত্বে আছে আমাদের থেকে, কাজেই অনেক বড় একটা তারা বেশি দূরে থাকলে তার উজ্জ্বলতা কম মনে হবে আপাতদৃষ্টিতে। সেক্ষেত্রে উজ্জ্বলতার এই সংখ্যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের তেমন কোনো কাজে আসবে না। উপরে দেয়া সব উজ্জ্বলতার পরিমাপ এদের আপাত উজ্জ্বলতা। তারাদের পারস্পরিক তুলনার জন্য বেশি কাজে আসে তাদের প্রকৃত উজ্জ্বলতা। তারাদের জন্য এই প্রকৃত উজ্জ্বলতার সংজ্ঞা হল, তারাটি যদি পৃথিবী আর সূর্য থেকে ১০ পার্সেক (প্রায় ৩২.৬ আলোকবর্ষ ) দূরে থাকতো, তাহলে এর আপাত উজ্জ্বলতা যা হতো, তা ই। কারো কাছে অনেকগুলো ছোটবড় নানান উজ্জ্বলতার বাতি থাকলে, সেগুলোর কোনটা বেশি উজ্জ্বল আর কোনটা কম, তা বুঝতে যদি সবগুলো বাতি জ্বালিয়ে ১০ মিটার দূরে সমান দূরত্বে রেখে তাদের উজ্জ্বলতা মাপা হয় ব্যাপারটা তেমন। এসে করে কোনটা বেশি উজ্জ্বল আর কোনটা কম, এর সাথে কোনটা কতো দূরে তার চিন্তা করতে হয়না আর। তো এই তুলনা করে লাভটা কী? সবচেয়ে সহজ আর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো দূরত্ব মাপা। যেহেতু প্রকৃত উজ্জ্বলতা বলছে যে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে এই তারা কতোটা উজ্জ্বল, আর আমরা আপাতভাবে দেখছি এই তারা কতোটা উজ্জ্বল, আর উজ্জ্বলতা দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে এর বর্গের সমানুপাতিক হারে কমতে থাকে, এই সহজ হিসেব মিলিয়ে নিলেই এই দুই উজ্জ্বলতা থেকে তারার দূরত্ব মাপা যায়। এই দূরত্ব মেপেই আমরা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করতে পারছি, আবার আকাশগঙ্গার স্যাটেলাইট ছায়াপথ ছোট (আর বড়) ম্যাজেলানিক মেঘের তারাদের দূরত্ব মেপেই প্রথম আমরা বুঝতে পারি যে আকাশগঙ্গাই একমাত্র ছায়াপথ নয়, বরং মহাবিশ্বে অসংখ্য ছায়াপথ আছে। যাহোক, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে দূরত্বের আর সঠিকভাবে দূরত্ব পরিমাপের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সে ব্যাপারে আরেকদিন বিশদ বলা যাবে! 

বলছিলাম ৬.৫ উজ্জ্বলতার সীমায় মাত্র ৪০৯৬টা তারা দেখতে পারার কথা! এখন, যদি দূষণ মুক্ত আকাশের বদলে ঢাকার মতো শহরের আকাশের কথা ভাবি? শহরের নানান আলোকসজ্জা, বাতি, আর ধোঁয়াশার কারণে দৃশ্যমান তারার উজ্জ্বলতা ৬ থেকে এসব জায়গায় নেমে আসে ২.৫ এর ও নিচে। তাতে সপ্তর্ষি মণ্ডলের তারাদের চাইতে অনুজ্জ্বল কোনও তারা দেখা সম্বব হয় না। আর দুই গোলার্ধ মিলিয়ে দেখতে পারা তারার সংখ্যা নেমে আসে ৭০এ! স্টেলারিয়ামের মতো সফটওয়ার দিয়ে দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার সীমা ঠিক করে যে কেউ দেখে নিতে পারি এই উজ্জ্বল তারাদের সংখ্যা।        

আর যদি দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার সীমা আমরা বাড়িয়ে দিতে পারি টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলার দিয়ে? এদিক দিয়ে বলা যেতে পারে যে প্রকৃতি পুঁজিবাদের মতো এক নিয়ম মেনে চলে – যতো কম উজ্জ্বল আর ছোট তারা, ততো বেশি এদের সংখ্যা। তাই একটু অনুজ্জ্বল তারা দেখতে পারলেই এর সংখ্যা সূচকীয় হারে বাড়তে থাকে। ৫০ মিমি বাইনোকুলার দিয়ে প্রায় উজ্জ্বলতা ৯ পর্যন্ত দেখা যায়, এতে প্রায় দুই লাখের বেশি তারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর যদি একটা ৩ইঞ্চি টেলিস্কোপ জোগাড় করা যায়, তাহলে সুবিধাজনক জায়গায় থাকলে প্রায় ৫৩ লক্ষ তারা চোখে পড়ে। আসলে তার প্রায় অর্ধেক যেহেতু আমরা পৃথিবীর অর্ধেক অংশের আকাশ দেখছি। কিন্তু কে গুনতে যাচ্ছে!  

Dr. Dorrit Hoffleit while obtaining her degree.

শেষ করছি ডরিট হফ্লেইটের ব্যাপারে দু’কথা বলে। ১৯০৭ সালের মার্চ মাসে তাঁর জন্ম। মাত্র ২৩ বছর বয়সে হার্ভার্ড কলেজ মানমন্দিরে হ্যার্লো শেইপলীর সাথে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি, ১৯৩৮ সালে পান ডক্টরেট ডিগ্রি। সেই সময় নারী জ্যোতির্বিদের সংখ্যা ছিল নেহাতই হাতে গোনার মতো। এমন পরিবেশেও তিনি বিষম তারা, অ্যাস্ট্রোমেট্রি, আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের মতো বিষয়ে বিশ্বখ্যাত ছিলেন তাঁর কাজের জন্য। ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ থেকে অব্যাহতি নিলেও বয়স ৯০ এর কোঠায় থাকার সময়ও নিয়মিত কাজ করে গিয়েছেন। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে, তাঁর ১০০তম জন্মবার্ষিকী পালনের কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ তাঁর উজ্জ্বল তারার তালিকা। গবেষণার পাশাপাশি তিনি মেয়েদের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায় উৎসাহী করতে কাজ করেছেন। ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীর নাম আমার মনে হয় জীবন সম্পর্কে তাঁর দ্রশ্তিভঙ্গি খুব ভালভাবেই তুলে ধরে, ‘Misfortunes as Blessings in Disguise: The story of my life’। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।  

Categories
Astrophysics

উল্কা আর উল্কাবৃষ্টি

গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রাতের আকাশে একটা ছোট আলোর বিন্দু হঠাত করে নিচের দিকে পড়ে যেতে আমরা অনেকেই দেখেছি। মনে হয় যেন আকাশ ভরা মিটমিটে তারাগুলো থেকে একটা বুঝি টুপ করে পড়ে গেল! এব্যাপারে বড়দের জিজ্ঞাসা করে এগুলো যে ‘খসে পড়া তারা’-ই, তাও হয়ত শুনেছি অনেকে। আবার এই ‘খসে পড়া তারার’ মত দেখতে জিনিসগুলি যে আদতে তারাই নয়, বরং এদের নাম ‘উল্কা’ তা-ও কেউ কেউ জানি। কিন্তু ‘উল্কা’ জিনিসটা আসলে কি অথবা উল্কাবৃষ্টি আসলে কেন হয়? আর কেনইবা উল্কাদের খসে পড়া তারার মত দেখায় এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তরগুলি আমাদের অনেকের কাছেই কিছুটা ধোয়াটে।

উল্কার সংজ্ঞাটা বেশ সাদাসিধা। কোনো মহাজাগতিক বস্তু(সহজ কথায় যেসব বস্তু মহাকাশে ঘুরে বেড়ায়) পৃথিবীর যথেষ্ট কাছে এসে পড়লে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের প্রভাবে এটি ভূপৃষ্ঠের দিকে তীব্র বেগে এগুতে থাকে আর এসময় এর সাথে বায়ুমণ্ডলের কণাগুলোর সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। তখন যে ক্ষণস্থায়ী সরু আলোর রেখা দেখা যায়, তা-ই উল্কা। বেশিরভাগ সময়ই উল্কার আকার এত ছোট হয় যে এটি আসার পথেই জ্বলে ছাই হয়ে যায়। যদি এটি মোটামুটি বড় আকারের হয় তবে এর যে অবশিষ্টাংশ ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে তা হল উল্কাপিণ্ড।

কথা হল, কোন মহাজাগতিক বস্তু আসে এমনভাবে? পৃথিবীর চারপাশে শুক্র বা মঙ্গলের আগে পর্যন্ত তো তেমন কিছুই নেই, তাহলে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে প্রতি ঘণ্টায়ই যে গড়ে ৫টি উল্কাপাত দেখা যায়, তার উৎপত্তি কোথায়? উত্তর হল- অনেক জায়গাতেই! আসল কথা হল, সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট পরিচিত সদস্য গ্রহাণুগুলোও পৃথিবীর বেশ দূরে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু, এগুলো ছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট বালুকণা বা পাথরের টুকরোর মত পদার্থ ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। আর মোটামুটি সিংহভাগ উল্কাই এসব কণার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জ্বলে ওঠার দৃশ্য। তাই এদের কেউই পৃথিবী পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। প্রতি ১০০ বছরে হয়ত মাত্র কয়েকটি ছোট খাটো টুকরো পৃথিবী পর্যন্ত এসে পৌঁছে আর এখানে এসে বিশালাকার খাদ কিংবা ডাইনোসরদের বিলুপ্ত করে দেবার মত ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী উল্কা আসার সম্ভাবনা মোটামুটি প্রতি ৩লক্ষ বছরে একবার মাত্র। এগুলো হল গ্রহানু বেল্টের কোনো বিক্ষিপ্ত সদস্যর কাজ যেটি ঘুরতে ঘুরতে মঙ্গল ও পরে পৃথিবীর আকর্ষণে পথ বদলাতে গিয়ে শেষমেশ পৃথিবীর মহাকর্ষ বল এড়াতে না পেরে এখানে আছড়ে পড়ে।

সাধারনত, ভোরের দিকে সন্ধ্যার চেয়ে বেশি উল্কা দেখা যায়। কারণ, সেসময় পৃথিবীর গতির দিকেই উল্কাদের অবস্থান হয়। খালি চোখে আমরা যেসব উল্কা দেখি সেগুলো প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উপরে থাকে আর এদের বেগ থাকে প্রায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার/সেকেন্ড।

এ তো গেল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া উল্কার কথা। এখন আসি উল্কাবৃষ্টিতে। প্রতি বছরই কিছু নির্দিষ্ট দিনে আকাশে উল্কার পরিমান বেশ বেড়ে যায় (প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০/৪০ টি)- একেই বলে উল্কাবৃষ্টি। আর এই অসংখ্য উল্কা আকাশের একেকটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই আসে। এই জায়গাগুলিকে বলে বিকিরণ বিন্দু বা ‘radiant’। এ থেকে মনে আসতেই পারে যে এগুলো নিশ্চয়ই একই মাতৃবস্তু থেকে আসছে; আসলেও তাই। সূর্যের কাছে যে সকল ধূমকেতু আসে সেগুলোর বিশাল আর সুবিস্তৃত বরফকণাপূর্ণ গ্যাসীয় লেজের যেসব অবশিষ্টাংশ এদের কক্ষপথের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকে, পৃথিবী তার চলার পথে এদের কাছে চলে আসলে মোটামুটি কাছাকাছি অঞ্চল থেকে এরা উল্কা হয়ে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। এভাবে একেকটি ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধূলিকণার দঙ্গল থেকেই বেশিরভাগ উল্কাবৃষ্টি হয় বলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে একেকটি উল্কাবৃষ্টি হয়। আর এই নির্দিষ্ট বিন্দুগুলো মূলত আকাশের পটভূমিতে একেকটি তারামণ্ডলের মধ্যে থাকে। তাই অবস্থান সনাক্তকরণ সহজ করতে একেকটি উল্কাবৃষ্টি যে তারামণ্ডলের পটভূমিতে হয়- তার নামকরণ সেই তারামণ্ডলের নামানুসারে হয়। এসময় সেই মণ্ডলের নামের শেষে সাধারনত –ids অথবা –nids যোগ করা হয়। অনেক সময় মণ্ডলের নামের শেষের দু-একটা বর্ণ বাদ দিয়েও শেষাংশ যোগ করা হয়। যেমনঃ আগস্টের ১২ তারিখে যে উল্কাবৃষ্টি দেখা যায় তার নাম ‘পারসেইডস’ (perseids)উল্কাবৃষ্টি যেটির নামকরণ হয়েছে পারসিয়াস তারামণ্ডল থেকে আর এটি হয় ‘সুইফট টাটল’ নামক ধূমকেতুর অবশিষ্টাংশ থেকে। অক্টোবর মাসের ২০ তারিখে দেখা যায় ‘ওরায়নিডস’ (orionids) নামক উল্কাবৃষ্টি যেটির নামকরণ আর কারণ যথাক্রমে কালপুরুষ মণ্ডল আর হ্যালির ধূমকেতুর অবশিষ্ট। নিচের ছকে বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উল্কাবৃষ্টির নাম ও সময় দেওয়া হলঃ

নাম —সর্বোচ্চ উল্কাপাতের দিন (সাধারণত)

কোয়াড্রানটিডস (Quadrantids) —জানুয়ারী ৩

লাইরিডস (Lyrids) —এপ্রিল ২১

ইটা অ্যাকুয়ারিডস (Eta Aquarids) — মে ৫

পারসেইডস (Perseids) —আগস্ট ১২

ওরায়নিডস (Orionids) —অক্টোবর ২০

লিওনিডস (Leonids) —নভেম্বর ১৭

জেমিনিডস (Geminids) —ডিসেম্বর ১৩

এই দিনগুলিতে বা তার একদিন আগে-পরের দিনে ঢাকার মত আলো-দূষণময় শহরগুলি ছাড়া অন্য যেকোনো জায়গাতেই থাকো না কেন, রাতের আকাশে ঘন্টাখানেক তাকালে ৩০/৪০টা না হলেও, অন্ততপক্ষে ৫/১০টা উল্কা চোখে পড়বেই। আর ভাগ্য ভালো হলে একসাথে কয়েকটাও দেখা যায় মাঝে মাঝে। ব্যাখ্যা জানা থাকুক আর নাই থাকুক, তারাভরা আকাশ দেখা যেমন মজার, উল্কা, ধূমকেতু, গ্রহণের মত মহাজাগতিক ঘটনা দেখা আরও বেশিই মজার। তাই এসব সময় উপযুক্ত জায়গায় থাকলে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ফেলাই ভালো। আর সেই সাথে ব্যাপারটা কি আর কেনো হচ্ছে তা জানা থাকলে তো কথাই নেই!     

দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা ২০১৫ সালের। এটাও কোনো ম্যাগাজিন বা শিশু সংকলনের জন্য লেখা। পুরনো লেখাগুলি জড়ো করে রাখতেই রেখে দিচ্ছি এখানে।

Categories
Astrophysics

তারাদের ঝাড়ু

আমার নানুবাড়ির গ্রাম সবচেয়ে কাছের শহর থেকেও মোটামুটি বেশ দূরে হওয়ায় সেখানে কিছুদিন আগেই মাত্র বিদ্যুৎ লাইন পৌঁছে। তাই ছোটবেলা থেকেই কালেভদ্রে সেখানে বেড়াতে গেলে শহরের একেবারেই উল্টো প্রকৃতি আর জীবন-যাপনের প্রতি একধরনের কৌতূহল মেশানো মুগ্ধতা সবসময়ই কাজ করত। আর সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করত রাতের আকাশ। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সেখানে সন্ধ্যার পরই ঝুপ করে রাত নেমে আসত। কেরোসিনের বাতি আর হ্যারিকেনের মৃদু হলদে আলোয় সে অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে উঠত। এই পটভূমিতে তারাভরা আকাশটাকে মনে হত বুঝি সত্যিকারের হীরের টুকরো দিয়ে সাজানো। সেখানেই মায়ের কাছে প্রথম আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেনা, মনে মনে তারা জোড়া লাগিয়ে সপ্তর্ষিমন্ডলের প্রশ্নবোধক চিহ্ন খুঁজে বের করা– – আর সেখানেই আমার জীবনে প্রথম এবং সবচেয়ে সুন্দর ধূমকেতুটি দেখা। অনেক পরে যার নাম জেনেছি ‘হেল-বপ’ (Hale-Bopp) যা ১৯৯৭ সালের গোড়ার দিকে নিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থায় ছিল। 

এখনো মনে আছে, দিগন্তের কিছু উপরে ছোট্ট একটা আলোর ঝাড়ু–র মত তারা দেখে কতটা কৌতূহল জেগেছিল মনে। কিন্তু সেই কৌতূহল মিটতে অনেক সময় লেগেছে। ধূমকেতু আসলে কী, এর উৎপত্তি কোথায় আর কেন – এরকম প্রশ্নগুলোর উত্তর একটু একটু করে জেনেছি। ‘ধূমকেতু’ কথাটা শুনলে তোমাদের মনেও নিশ্চয়ই এরকম প্রশ্নগুলো আসে, তাই না? তাহলে ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক!

‘ধূমকেতু’ – শব্দটার আক্ষরিক অর্থ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘ধোঁয়ার নিশান’। আবার এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Comet’ এসেছে গ্রীক শব্দ ‘Kometes’ থেকে যার বাংলা অর্থ বলা যায় ‘লম্বা চুলের তারা’। দু’টি নামেই পাওয়া যায় ধূমকেতুর ঔজ্জ্বল্য আর একটা ‘লেজের’ মত অংশের আভাস। আসলেও তাই। লেজের আকারের জন্য ধূমকেতু দেখতে শলার ঝাড়–, ধোঁয়ার পতাকা কিংবা লম্বা চুলের ঝুঁটি – নানারকমই মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুটা শক্তিশালী দূরবীনে দেখে যদি আমরা এর গঠন বুঝতে চাই, তাহলে মোটামুটি তিনটি অংশই পাওয়া যাবে। সেগুলো হল – নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রকণা (Nucleus), এটিকে ঘিরে থাকা ধূমকেতুর সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ কোমা (Coma) আর একটি বেশ বড়োসড়ো লেজ (Tail)। এগুলোর মধ্যে কেন্দ্রকণাই এর মূল স্থায়ী অংশ। বাকি দুটো কিছু বিশেষ সময়েই তৈরী হয় আর কেবল তখনই আমরা এদের দেখতে পাই। কেন্দ্রকণার আকার বেশ ছোট (কয়েকশ’ মিটার থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত)। এর প্রায় অর্ধেক উপাদানই হল ধূলো, বালুকণা বা ছোট পাথরের টুকরো। আর বাকি উপাদান হল পানি, অ্যামোনিয়া আর মিথেনের বরফ। এছাড়া সামান্য পরিমানে গ্যাস বা উদ্বায়ী পদার্থ থাকতে পারে। তাই নিউক্লিয়াসকে বলা হয় ‘নোংরা বরফের গোলা’ বা ‘Dirty snow ball’।এই গোলাটি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের মত একটা নির্দিষ্ট পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এভাবে চলতে গিয়ে এটি সূর্যের মোটামুটি কাছে (প্রায় পৃথিবীর থেকে দূরত্বের তিন গুণ) চলে আসলে এর কোমা বোঝা যায়। কোমাটি মূলত ধূলোবালির তৈরি যা ধূমকেতুর গতির কারনে এর কেন্দ্রকণার আশেপাশে ছড়িয়ে পরে। আর লেজটা প্রায় ১০,০০,০০০কি.মি. থেকে তার ১০০ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। ধূলোর তৈরি লেজের রঙ হয় হলদেটে আর আয়নিক কণার তৈরি হলে তার রঙ হয় অনেকটা নীলচে।  

লেজটা আসলে কেন হয়? ধূমকেতুতে যেহেতু প্রচুর বরফ থাকে, সূর্যের কাছাকাছি আসলে এগুলো গলতে শুরু করে। সূর্যের দিকে (বা বিপরীতে) ধূমকেতুর গতির কারনে এর গতির উল্টো দিকে এই গলে যাওয়া পদার্থকণাগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে লেজের মত অংশ তৈরি করে। আর সূর্যের আলো এই পুরো অংশে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে বলেই আমরা এত অদ্ভুত সুন্দর আকারের মহাজাগতিক বস্তুটি দেখি।  ধূমকেতুটির সূর্যকে ঘিরে ঘুরবার পথটি কত বড় তার উপর নির্ভর করে এটি কতদিন পরপর পুরো পথটি ঘুরে আবার সূর্যের কাছে আসবে, অর্থাৎ আমরা দেখতে পাবো। তার উপর ভিত্তি করে ধূমকেতুকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। স্বল্পমেয়াদী- যেগুলো মোটামুটি ২০০ বছরের মধ্যেই ফিরে আসে; আর দীর্ঘমেয়াদী – যেগুলো ঘুরে আসতে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত লাগে। 

আচ্ছা! ধূমকেতু কি, কেমন বা কতরকম তা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু কোথা থেকে আসে এগুলো? দুটি বিশাল এলাকায় মূলত এদের অবস্থান। কুইপার বেল্ট আর ঊর্ট মেঘ।সৌরজগতের সীমানা অর্থাৎ নেপচুনের পর থেকে প্রায় সূর্য থেকে নেপচুনের সমান দূরত্বের ব্যাসের এলাকা জুড়ে অসংখ্য বরফময় গ্রহাণুর মত ছোট ছোট বন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ অঞ্চলকে আবিষ্কারকের নামানুসারে বলা হয় কুইপার বেল্ট। এই সীমানার বাইরে আরও অনেক অনেক দূরে(সৌরজগতের সীমানার প্রায় হাজারগুণ) সম্পূর্ণ সৌরজগতকে ঘিরে এমনই বরফময় খন্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঘের গোলকের মত। এর নাম ঊর্ট মেঘ। এই দুই অঞ্চলের বস্তুগুলোই মূলত ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস। বিভিন্ন কারনে এদের উপর কার্যকর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তারতম্যের কারণে এগুলো থেকে দু’একটি করে হঠাত হঠাত সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের আওতায় পরে যায় আর এগিয়ে আসতে থাকে সৌরজগতের দিকে। সৌরজগতের সীমানায় বৃহস্পতি বা শনির মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে এগুলোর গতিপথ আরও ছোট হয়ে যায়। এগুলো স্বল্পমেয়াদী। আর বাকি ধূমকেতুগুলো রয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদী-ই। এই সবরকম কেন্দ্রকণাই চলতে চলতে সূর্যের কাছে এসে প্রথমে গলে-ছড়িয়ে সৃষ্টি করে কোমা যার একটা অংশ তৈরি করে লেজ। আর সূর্যের আলোর প্রতিফলনে এই নোংরা বরফের গোলাই দৃষ্টিনন্দন ধূমকেতু হয়ে আমাদের মুগ্ধ করে, ভাবায়, কৌতূহলী করে তোলে।

গড়ে প্রতি বছর ছয়টির বেশি ধূমকেতু নতুন আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু খালিচোখে দেখার মত বড় আর নিকটবর্তী ধূমকেতু আছে কমই। এরকম কয়েকটি বিখ্যাত ধূমকেতু হলঃ হ্যালির ধূমকেতু, হেল-বপ, কোহুতেক, শ্যুমেকার, আইসন, লাভজয়, হায়াকুতাকে ইত্যাদি। 

অনেক তো জানা হল। এখন রাতের আকাশে কখনো ঝাড়ুর মত কিছু দেখলে ভড়কে না গিয়ে বরং এটির গলে যাওয়া বরফের গঠন আর দূর-দূরান্ত পাড়ি দিয়ে আসার গল্প শুনিয়ে সবাইকে চমকে দিতে পারবে না? আশা করছি, অবশ্যই পারবে!   

দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা ২০১৪ সালের। চন্দ্রাবতী একাডেমীর শিশু সংকলনের জন্য লিখছিলাম খুব সম্ভবত, মনে নেই। যেহেতু এই ওয়েবসাইট করার একটা মূল উদ্দেশ্য হল আমার টুকটাক লেখালেখিগুলো এক জায়গায় রাখা, সাথে অভ্যাসটাও বাঁচানোর চেষ্টা – তাই প্রথমেই আগের কিছু লেখা পোস্ট করে রাখছি।